০৪:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
‎ সংসদ মাতালেন দুই শীর্ষ নেতাঃ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘তথ্য বিভ্রাট’ বনাম শফিকুর রহমানের ‘জাদুকরী’ বাচনভঙ্গি

হক বার্তা ডেস্ক রিপোর্টঃ
  • আপডেট সময়ঃ ০১:১৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬
  • / ২২ বার পড়া হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সপ্তম দিনটি ছিল যুক্তিতর্ক, নাটকীয়তা আর বাগযুদ্ধের এক অনন্য সমন্বয়। 

বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের মধ্যকার বাকচাতুর্য অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত অন্য সংসদ সদস্যদের যেমন বিনোদন জুগিয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক সচেতন মহলে উসকে দিয়েছে নানা আলোচনা। 

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৃহস্পতিবারের অধিবেশনে এই দুই নেতার বাদানুবাদে সরগরম হয়ে ওঠে সংসদের ফ্লোর।

‎ঘটনার সূত্রপাত হয় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের পয়েন্ট অব অর্ডারে দেওয়া একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। গত বুধবারের একটি প্রসঙ্গের রেশ টেনে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য উপস্থাপনের পাল্টা অভিযোগ তোলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমি সংসদ থেকে চলে যাওয়ার পর আমাকে ‘ভালোবেসে’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি মন্তব্য করেছেন যে, আমি নাকি এখানে অসত্য কথা বলে গেছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসলে অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। তিনি বোতল পরিবর্তন করে কিন্তু ভেতরে একই উপাদান বা মেটেরিয়াল ঠিক রেখে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য হিসেবে এমন চমৎকারভাবে পরিবেশন করতে পারেন, যা সচরাচর দেখা যায় না।”

‎তার এই বিদ্রুপাত্মক মন্তব্যের সময় সংসদ কক্ষে হাস্যরসের সৃষ্টি হলেও পরিস্থিতি দ্রুত গাম্ভীর্য ধারণ করে। ডা. শফিকুর রহমান আরও যোগ করেন যে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তার এই ‘অপূর্ব দক্ষতার’ জন্যই তিনি আজ ধন্যবাদ জানাতে দাঁড়িয়েছেন।

‎বিরোধীদলীয় নেতার এই আক্রমণের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদীয় রীতিনীতি ও শিষ্টাচারের প্রশ্ন তোলেন। তিনি সরাসরি ডা. শফিকুর রহমানের ব্যবহৃত ‘মিথ্যা’ শব্দটির ওপর তীব্র আপত্তি জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “বিরোধীদলীয় নেতা সরাসরি ‘মিথ্যা’ শব্দটি ব্যবহার করে অসংসদীয় আচরণ করেছেন। তিনি যদি একে ‘অসত্য’ বলে অভিহিত করতেন, তবে আমার কোনো আপত্তি থাকত না। কিন্তু সংসদীয় সংস্কৃতিতে ‘মিথ্যা’ শব্দটি ব্যবহার করা সমীচীন নয়।”

এ সময় তিনি বিরোধীদলীয় নেতার ঐ নির্দিষ্ট বক্তব্যটি সংসদের কার্যবিবরণী (এক্সপাঞ্জ) থেকে বাদ দেওয়ার জন্য স্পিকারের কাছে জোরালো দাবি জানান।

 

‎তর্ক-বিতর্কের এক পর্যায়ে গত বুধবারের ঘটনার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, সেদিন ডা. শফিকুর রহমান যে অভিযোগ করেছিলেন তা ছিল ভিত্তিহীন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, “রুল ৬২ অনুযায়ী বিরোধীদলীয় নেতারা যখন ওয়াকআউট করে সংসদ ত্যাগ করেন, তার অনেক পরে একজন বেসরকারি সদস্যের মূলতবি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। ফলে সেই প্রস্তাব আগে পঠিত বা উত্থাপিত হওয়া ছিল প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব। একারণেই আমি ওনার বক্তব্যকে অসত্য বলেছিলাম।”

 

‎স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ব্যাখ্যার বিপরীতে পাল্টা যুক্তি দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি দাবি করেন, এখানে কোনো ভুল তথ্য নেই বরং তথ্য উপস্থাপনের ভিন্নতা আছে।

তিনি বলেন, “বিভ্রান্তিটা অন্য জায়গায়। একই বিষয়বস্তুর ওপর একজন স্বতন্ত্র সদস্য একটি প্রস্তাব এনেছিলেন, যা বুধবার শুধু নাম বদলে ভিন্ন আঙ্গিকে এসেছে। যেহেতু আমি আগের প্রস্তাবটি সম্পর্কে অবগত ছিলাম, তাই আমি যা বলেছি তা তথ্যের ভিত্তিতেই বলেছি।”

 

‎দুই নেতার এই পাল্টাপাল্টি যুক্তি চলাকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম বারবার হস্তক্ষেপ করে পরিবেশ শান্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, বুধবারের ঘটনা নিয়ে আজ নতুন করে বিতর্কের অবকাশ নেই। সংসদীয় রীতিনীতি বজায় রেখে সকলকে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্পিকার দিনের পরবর্তী কর্মসূচিতে মনোনিবেশ করেন।

‎পুরো এই ঘটনায় ফুটে উঠেছে সংসদের দুই মেরুর দুই নেতার মধ্যকার তীক্ষ্ণ মেধা ও বাকযুদ্ধের প্রতিফলন।

‎তথ্যসহায়তাঃমানবজমিন

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

‎ সংসদ মাতালেন দুই শীর্ষ নেতাঃ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘তথ্য বিভ্রাট’ বনাম শফিকুর রহমানের ‘জাদুকরী’ বাচনভঙ্গি

আপডেট সময়ঃ ০১:১৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সপ্তম দিনটি ছিল যুক্তিতর্ক, নাটকীয়তা আর বাগযুদ্ধের এক অনন্য সমন্বয়। 

বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের মধ্যকার বাকচাতুর্য অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত অন্য সংসদ সদস্যদের যেমন বিনোদন জুগিয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক সচেতন মহলে উসকে দিয়েছে নানা আলোচনা। 

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৃহস্পতিবারের অধিবেশনে এই দুই নেতার বাদানুবাদে সরগরম হয়ে ওঠে সংসদের ফ্লোর।

‎ঘটনার সূত্রপাত হয় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের পয়েন্ট অব অর্ডারে দেওয়া একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। গত বুধবারের একটি প্রসঙ্গের রেশ টেনে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য উপস্থাপনের পাল্টা অভিযোগ তোলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমি সংসদ থেকে চলে যাওয়ার পর আমাকে ‘ভালোবেসে’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি মন্তব্য করেছেন যে, আমি নাকি এখানে অসত্য কথা বলে গেছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসলে অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। তিনি বোতল পরিবর্তন করে কিন্তু ভেতরে একই উপাদান বা মেটেরিয়াল ঠিক রেখে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য হিসেবে এমন চমৎকারভাবে পরিবেশন করতে পারেন, যা সচরাচর দেখা যায় না।”

‎তার এই বিদ্রুপাত্মক মন্তব্যের সময় সংসদ কক্ষে হাস্যরসের সৃষ্টি হলেও পরিস্থিতি দ্রুত গাম্ভীর্য ধারণ করে। ডা. শফিকুর রহমান আরও যোগ করেন যে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তার এই ‘অপূর্ব দক্ষতার’ জন্যই তিনি আজ ধন্যবাদ জানাতে দাঁড়িয়েছেন।

‎বিরোধীদলীয় নেতার এই আক্রমণের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদীয় রীতিনীতি ও শিষ্টাচারের প্রশ্ন তোলেন। তিনি সরাসরি ডা. শফিকুর রহমানের ব্যবহৃত ‘মিথ্যা’ শব্দটির ওপর তীব্র আপত্তি জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “বিরোধীদলীয় নেতা সরাসরি ‘মিথ্যা’ শব্দটি ব্যবহার করে অসংসদীয় আচরণ করেছেন। তিনি যদি একে ‘অসত্য’ বলে অভিহিত করতেন, তবে আমার কোনো আপত্তি থাকত না। কিন্তু সংসদীয় সংস্কৃতিতে ‘মিথ্যা’ শব্দটি ব্যবহার করা সমীচীন নয়।”

এ সময় তিনি বিরোধীদলীয় নেতার ঐ নির্দিষ্ট বক্তব্যটি সংসদের কার্যবিবরণী (এক্সপাঞ্জ) থেকে বাদ দেওয়ার জন্য স্পিকারের কাছে জোরালো দাবি জানান।

 

‎তর্ক-বিতর্কের এক পর্যায়ে গত বুধবারের ঘটনার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, সেদিন ডা. শফিকুর রহমান যে অভিযোগ করেছিলেন তা ছিল ভিত্তিহীন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, “রুল ৬২ অনুযায়ী বিরোধীদলীয় নেতারা যখন ওয়াকআউট করে সংসদ ত্যাগ করেন, তার অনেক পরে একজন বেসরকারি সদস্যের মূলতবি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। ফলে সেই প্রস্তাব আগে পঠিত বা উত্থাপিত হওয়া ছিল প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব। একারণেই আমি ওনার বক্তব্যকে অসত্য বলেছিলাম।”

 

‎স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ব্যাখ্যার বিপরীতে পাল্টা যুক্তি দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি দাবি করেন, এখানে কোনো ভুল তথ্য নেই বরং তথ্য উপস্থাপনের ভিন্নতা আছে।

তিনি বলেন, “বিভ্রান্তিটা অন্য জায়গায়। একই বিষয়বস্তুর ওপর একজন স্বতন্ত্র সদস্য একটি প্রস্তাব এনেছিলেন, যা বুধবার শুধু নাম বদলে ভিন্ন আঙ্গিকে এসেছে। যেহেতু আমি আগের প্রস্তাবটি সম্পর্কে অবগত ছিলাম, তাই আমি যা বলেছি তা তথ্যের ভিত্তিতেই বলেছি।”

 

‎দুই নেতার এই পাল্টাপাল্টি যুক্তি চলাকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম বারবার হস্তক্ষেপ করে পরিবেশ শান্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, বুধবারের ঘটনা নিয়ে আজ নতুন করে বিতর্কের অবকাশ নেই। সংসদীয় রীতিনীতি বজায় রেখে সকলকে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্পিকার দিনের পরবর্তী কর্মসূচিতে মনোনিবেশ করেন।

‎পুরো এই ঘটনায় ফুটে উঠেছে সংসদের দুই মেরুর দুই নেতার মধ্যকার তীক্ষ্ণ মেধা ও বাকযুদ্ধের প্রতিফলন।

‎তথ্যসহায়তাঃমানবজমিন