০২:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬

ভালোবাসার এক অনন্য ওজন: মৃত স্ত্রীর শেষ ইচ্ছা পূরণ করলেন নানা

হক বার্তা ডেস্ক রিপোর্টঃ
  • আপডেট সময়ঃ ০৩:৩৯:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬
  • / ১০ বার পড়া হয়েছে।

গল্পটির শুরু আজ থেকে ২৩ বছর আগে। বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া দক্ষিণপাড়া এলাকার বাসিন্দা, পেশায় গাড়িচালক আবদুল কাদেরের মেয়ে ফেরদৌসী খাতুন যখন একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন, তখন খুশিতে আত্মহারা হয়ে যান নানি পাতা বেগম। নাতনি নাঈমা খাতুনকে কোলে নিয়ে তিনি সেদিন এক অদ্ভুত কিন্তু আবেগঘন ঘোষণা দিয়েছিলেন—নাতনি বড় হলে তার বিয়েতে তাকে দাঁড়িপাল্লায় বসিয়ে তার ওজনের সমান ওজনের ধাতব মুদ্রা বা কয়েন উপহার দেবেন। স্ত্রীর এই শখের কথা শুনে নানা আবদুল কাদেরও সানন্দে সায় দেন।

সেই দিন থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ সাধনা। নাতনি নাঈমার বয়স বাড়ার সাথে সাথে আবদুল কাদের ও পাতা বেগম দম্পতি তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী মাটির ব্যাংকে একটি একটি করে কয়েন জমাতে শুরু করেন। দিন যায়, বছর ঘুরে যায়, কিন্তু তাদের সেই জমানোর নেশা একটুও কমেনি।

নিয়তির পরিহাসে প্রায় দুই বছর আগে পাতা বেগম মারা যান। তার আজীবনের লালিত স্বপ্ন ছিল নাতনির বিয়েতে এই উপহার নিজ হাতে দেবেন। পাতা বেগমের মৃত্যুর কয়েক মাস পরেই নাঈমার বিয়ে হয় বগুড়া শহরের বেজোড়া এলাকার হৃদয় হোসেনের সাথে। কিন্তু বিয়ের সময় দেখা যায়, মাটির ব্যাংকে জমানো কয়েনের পরিমাণ তখনও নাঈমার ওজনের সমান হয়নি। ফলে নাতনির বিয়ের আসরে নানির সেই ইচ্ছা তখনো অপূর্ণই থেকে যায়।

আবদুল কাদের হাল ছাড়েননি। স্ত্রীর মৃত্যুর পর এবং নাতনির বিয়ের পরেও তিনি কয়েন জমানো চালিয়ে যান। অবশেষে সম্প্রতি জমানো কয়েনের পরিমাণ নাঈমার ওজনের সমান হয়। এদিকে নাঈমা বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা, তাই দেরি না করে নানির সেই পুরনো ইচ্ছা পূরণের সিদ্ধান্ত নেন নানা।

গত শুক্রবার আবদুল কাদেরের বাড়িতে আয়োজন করা হয় এক বিশাল উৎসবের। আত্মীয়স্বজন এবং পাড়া-প্রতিবেশীসহ প্রায় ১৫০ জন অতিথিকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো হয়। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল সেই দাঁড়িপাল্লা। একদিকে নাতনি নাঈমা খাতুনকে বসানো হয়, আর অন্য পাল্লায় একের পর এক ঢালা হতে থাকে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে জমানো প্রায় দেড় বস্তা ধাতব মুদ্রা। মেপে দেখা যায়, নাঈমার ওজন ৭০ কেজি ৩০০ গ্রাম, আর তার বিপরীতে দেওয়া মুদ্রার ওজনও সমান! এই মুদ্রার বেশিরভাগই ছিল ৫ টাকার কয়েন।

পুরো ঘটনাটি যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন অনেকেই এই বৃদ্ধ নানার ধৈর্য ও ভালোবাসার প্রশংসা করেন। নানা আবদুল কাদের আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “নাতনিকে উপহার দিতে আমি ২৩ বছর ধরে এই কয়েনগুলো জমিয়েছি। আজ যদি আমার স্ত্রী বেঁচে থাকতেন, তবে তিনিই সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন।”

অন্যদিকে, নাতনি নাঈমা খাতুনও তার নানার এই ভালোবাসায় অভিভূত। তিনি জানান, নানির শখ পূরণ করতে নানা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা তার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। নানিকে পাশে না পাওয়ার শূন্যতা থাকলেও নানার এই অভাবনীয় আয়োজনে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত।

 

বগুড়ার এই সাধারণ পরিবারটি প্রমাণ করে দিল যে, ইচ্ছা এবং ভালোবাসা থাকলে ছোট ছোট জমানো পয়সাও একদিন বিশাল এক পাহাড়সম খুশির কারণ হতে পারে।

ট্যাগসঃ

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

ভালোবাসার এক অনন্য ওজন: মৃত স্ত্রীর শেষ ইচ্ছা পূরণ করলেন নানা

আপডেট সময়ঃ ০৩:৩৯:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

গল্পটির শুরু আজ থেকে ২৩ বছর আগে। বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া দক্ষিণপাড়া এলাকার বাসিন্দা, পেশায় গাড়িচালক আবদুল কাদেরের মেয়ে ফেরদৌসী খাতুন যখন একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন, তখন খুশিতে আত্মহারা হয়ে যান নানি পাতা বেগম। নাতনি নাঈমা খাতুনকে কোলে নিয়ে তিনি সেদিন এক অদ্ভুত কিন্তু আবেগঘন ঘোষণা দিয়েছিলেন—নাতনি বড় হলে তার বিয়েতে তাকে দাঁড়িপাল্লায় বসিয়ে তার ওজনের সমান ওজনের ধাতব মুদ্রা বা কয়েন উপহার দেবেন। স্ত্রীর এই শখের কথা শুনে নানা আবদুল কাদেরও সানন্দে সায় দেন।

সেই দিন থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ সাধনা। নাতনি নাঈমার বয়স বাড়ার সাথে সাথে আবদুল কাদের ও পাতা বেগম দম্পতি তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী মাটির ব্যাংকে একটি একটি করে কয়েন জমাতে শুরু করেন। দিন যায়, বছর ঘুরে যায়, কিন্তু তাদের সেই জমানোর নেশা একটুও কমেনি।

নিয়তির পরিহাসে প্রায় দুই বছর আগে পাতা বেগম মারা যান। তার আজীবনের লালিত স্বপ্ন ছিল নাতনির বিয়েতে এই উপহার নিজ হাতে দেবেন। পাতা বেগমের মৃত্যুর কয়েক মাস পরেই নাঈমার বিয়ে হয় বগুড়া শহরের বেজোড়া এলাকার হৃদয় হোসেনের সাথে। কিন্তু বিয়ের সময় দেখা যায়, মাটির ব্যাংকে জমানো কয়েনের পরিমাণ তখনও নাঈমার ওজনের সমান হয়নি। ফলে নাতনির বিয়ের আসরে নানির সেই ইচ্ছা তখনো অপূর্ণই থেকে যায়।

আবদুল কাদের হাল ছাড়েননি। স্ত্রীর মৃত্যুর পর এবং নাতনির বিয়ের পরেও তিনি কয়েন জমানো চালিয়ে যান। অবশেষে সম্প্রতি জমানো কয়েনের পরিমাণ নাঈমার ওজনের সমান হয়। এদিকে নাঈমা বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা, তাই দেরি না করে নানির সেই পুরনো ইচ্ছা পূরণের সিদ্ধান্ত নেন নানা।

গত শুক্রবার আবদুল কাদেরের বাড়িতে আয়োজন করা হয় এক বিশাল উৎসবের। আত্মীয়স্বজন এবং পাড়া-প্রতিবেশীসহ প্রায় ১৫০ জন অতিথিকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো হয়। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল সেই দাঁড়িপাল্লা। একদিকে নাতনি নাঈমা খাতুনকে বসানো হয়, আর অন্য পাল্লায় একের পর এক ঢালা হতে থাকে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে জমানো প্রায় দেড় বস্তা ধাতব মুদ্রা। মেপে দেখা যায়, নাঈমার ওজন ৭০ কেজি ৩০০ গ্রাম, আর তার বিপরীতে দেওয়া মুদ্রার ওজনও সমান! এই মুদ্রার বেশিরভাগই ছিল ৫ টাকার কয়েন।

পুরো ঘটনাটি যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন অনেকেই এই বৃদ্ধ নানার ধৈর্য ও ভালোবাসার প্রশংসা করেন। নানা আবদুল কাদের আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “নাতনিকে উপহার দিতে আমি ২৩ বছর ধরে এই কয়েনগুলো জমিয়েছি। আজ যদি আমার স্ত্রী বেঁচে থাকতেন, তবে তিনিই সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন।”

অন্যদিকে, নাতনি নাঈমা খাতুনও তার নানার এই ভালোবাসায় অভিভূত। তিনি জানান, নানির শখ পূরণ করতে নানা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা তার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। নানিকে পাশে না পাওয়ার শূন্যতা থাকলেও নানার এই অভাবনীয় আয়োজনে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত।

 

বগুড়ার এই সাধারণ পরিবারটি প্রমাণ করে দিল যে, ইচ্ছা এবং ভালোবাসা থাকলে ছোট ছোট জমানো পয়সাও একদিন বিশাল এক পাহাড়সম খুশির কারণ হতে পারে।