০৫:৩৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬
লটারি প্রথার অবসানঃ

২০২৭ থেকে স্কুলে ফিরছে সেই পুরোনো ‘ভর্তি যুদ্ধ

হক বার্তা ডেস্ক রিপোর্টঃ
  • আপডেট সময়ঃ ১১:৪৭:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
  • / ২৪ বার পড়া হয়েছে।

দেশের স্কুলগুলোতে দীর্ঘ দেড় দশকের লটারি ব্যবস্থার ইতি টেনে আবারও ভর্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে ওপরের সব শ্রেণিতে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষায় বসতে হবে। 

আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সরকারের এই নতুন শিক্ষানীতিগত পরিবর্তনের কথা জানান। গত সরকারের আমলে চালু হওয়া লটারি পদ্ধতিকে ‘অযুক্তিসঙ্গত’ আখ্যা দিয়ে তিনি স্পষ্ট জানান, ভর্তিতে স্বচ্ছতা ও মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতেই এই প্রত্যাবর্তন

শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো যখন গত রোববারই জাতীয় সংসদে তিনি লটারি প্রথা বাতিলের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, লটারি ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের বিষয়টি তাঁর কাছে সঠিক মনে হয়নি এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এর ঠিক একদিন পরেই আজ তিনি নিশ্চিত করলেন যে, ভর্তিতে লটারির পরিবর্তে আবারও পরীক্ষা পদ্ধতি কার্যকর হতে যাচ্ছে।

যদিও মন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে প্রাথমিক স্তরের এই পরীক্ষাগুলো হবে অত্যন্ত সাধারণ মানের, তবে এই ‘সাধারণ’ পরীক্ষাই শিশুদের কোমল মনে কতটা চাপ সৃষ্টি করবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।

‎সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে দেশের শিক্ষাবিদ ও অভিভাবক মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের মতে, ভর্তি পরীক্ষা মানেই হলো শৈশবেই শিশুদের এক অসম প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দেওয়া।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন সরাসরি এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে জানিয়েছেন, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো ধরনের পরীক্ষাই নেওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারা একটি শিশুর মনে আজীবনের জন্য এই ধারণা গেঁথে দেয় যে সে মেধাবী নয়। এই ‘ট্যাগিং’ পদ্ধতি শিশুদের মারাত্মক মানসিক ট্রমার দিকে ঠেলে দেয় এবং শিক্ষার আনন্দ কেড়ে নেয়।

 

‎একই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ। তিনি মনে করেন, ভর্তি পরীক্ষা চালুর ফলে আবারও সেই পুরোনো কোচিং বাণিজ্য ও গাইড বইয়ের রমরমা ব্যবসা চাঙ্গা হয়ে উঠবে। 

তাঁর বিশ্লেষণে, ভর্তি পরীক্ষা মূলত সেইসব উচ্চবিত্ত বা উচ্চাভিলাষী মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের সুবিধা দেবে, যাদের কোচিং করানোর সামর্থ্য আছে। ফলে সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিশুরা ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।

 

‎অতীতে দেখা গেছে, নামি স্কুলগুলোতে ভর্তিকে কেন্দ্র করে বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই ২০১১ সাল থেকে ধাপে ধাপে লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল যেন ভর্তি নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ হয়। বিশেষ করে ২০২১ সাল থেকে সব শ্রেণিতে লটারি বাধ্যতামূলক করার পর সাধারণ মানুষের সন্তানদের নামকরা স্কুলে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

এখন আবারও পরীক্ষা পদ্ধতি ফিরে আসায় সেই পুরোনো অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং ভর্তি বাণিজ্যের ভূত ফিরে আসার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‎সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী এই সিদ্ধান্তকে ‘তাড়াহুড়ো’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি মনে করেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে এখনো অনেক সময় বাকি, তাই এত বড় একটি পরিবর্তন আনার আগে আরও গভীর গবেষণা ও অংশীজনদের সঙ্গে বিশদ আলোচনার প্রয়োজন ছিল। যদিও শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন যে তারা ধীরে ধীরে ‘জোনিং সিস্টেম’ বা এলাকাভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থা চালু করবেন, তবে পরীক্ষা পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা সেই পরিকল্পনার সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

 

‎সব মিলিয়ে, ২০২৭ সাল থেকে শিশুদের কাঁধে আবারও সেই ভারী সিলেবাস আর কোচিংয়ের চাপ ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যে বয়সে শিশুদের মাঠে খেলে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সে তাদের আবারও মুখস্থ বিদ্যার লড়াইয়ে নামতে হবে কি না—এখন সেটাই বড় প্রশ্ন।

 

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

লটারি প্রথার অবসানঃ

২০২৭ থেকে স্কুলে ফিরছে সেই পুরোনো ‘ভর্তি যুদ্ধ

আপডেট সময়ঃ ১১:৪৭:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬

দেশের স্কুলগুলোতে দীর্ঘ দেড় দশকের লটারি ব্যবস্থার ইতি টেনে আবারও ভর্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে ওপরের সব শ্রেণিতে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষায় বসতে হবে। 

আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সরকারের এই নতুন শিক্ষানীতিগত পরিবর্তনের কথা জানান। গত সরকারের আমলে চালু হওয়া লটারি পদ্ধতিকে ‘অযুক্তিসঙ্গত’ আখ্যা দিয়ে তিনি স্পষ্ট জানান, ভর্তিতে স্বচ্ছতা ও মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতেই এই প্রত্যাবর্তন

শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো যখন গত রোববারই জাতীয় সংসদে তিনি লটারি প্রথা বাতিলের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, লটারি ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের বিষয়টি তাঁর কাছে সঠিক মনে হয়নি এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এর ঠিক একদিন পরেই আজ তিনি নিশ্চিত করলেন যে, ভর্তিতে লটারির পরিবর্তে আবারও পরীক্ষা পদ্ধতি কার্যকর হতে যাচ্ছে।

যদিও মন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে প্রাথমিক স্তরের এই পরীক্ষাগুলো হবে অত্যন্ত সাধারণ মানের, তবে এই ‘সাধারণ’ পরীক্ষাই শিশুদের কোমল মনে কতটা চাপ সৃষ্টি করবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।

‎সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে দেশের শিক্ষাবিদ ও অভিভাবক মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের মতে, ভর্তি পরীক্ষা মানেই হলো শৈশবেই শিশুদের এক অসম প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দেওয়া।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন সরাসরি এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে জানিয়েছেন, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো ধরনের পরীক্ষাই নেওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারা একটি শিশুর মনে আজীবনের জন্য এই ধারণা গেঁথে দেয় যে সে মেধাবী নয়। এই ‘ট্যাগিং’ পদ্ধতি শিশুদের মারাত্মক মানসিক ট্রমার দিকে ঠেলে দেয় এবং শিক্ষার আনন্দ কেড়ে নেয়।

 

‎একই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ। তিনি মনে করেন, ভর্তি পরীক্ষা চালুর ফলে আবারও সেই পুরোনো কোচিং বাণিজ্য ও গাইড বইয়ের রমরমা ব্যবসা চাঙ্গা হয়ে উঠবে। 

তাঁর বিশ্লেষণে, ভর্তি পরীক্ষা মূলত সেইসব উচ্চবিত্ত বা উচ্চাভিলাষী মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের সুবিধা দেবে, যাদের কোচিং করানোর সামর্থ্য আছে। ফলে সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিশুরা ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।

 

‎অতীতে দেখা গেছে, নামি স্কুলগুলোতে ভর্তিকে কেন্দ্র করে বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই ২০১১ সাল থেকে ধাপে ধাপে লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল যেন ভর্তি নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ হয়। বিশেষ করে ২০২১ সাল থেকে সব শ্রেণিতে লটারি বাধ্যতামূলক করার পর সাধারণ মানুষের সন্তানদের নামকরা স্কুলে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

এখন আবারও পরীক্ষা পদ্ধতি ফিরে আসায় সেই পুরোনো অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং ভর্তি বাণিজ্যের ভূত ফিরে আসার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‎সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী এই সিদ্ধান্তকে ‘তাড়াহুড়ো’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি মনে করেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে এখনো অনেক সময় বাকি, তাই এত বড় একটি পরিবর্তন আনার আগে আরও গভীর গবেষণা ও অংশীজনদের সঙ্গে বিশদ আলোচনার প্রয়োজন ছিল। যদিও শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন যে তারা ধীরে ধীরে ‘জোনিং সিস্টেম’ বা এলাকাভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থা চালু করবেন, তবে পরীক্ষা পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা সেই পরিকল্পনার সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

 

‎সব মিলিয়ে, ২০২৭ সাল থেকে শিশুদের কাঁধে আবারও সেই ভারী সিলেবাস আর কোচিংয়ের চাপ ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যে বয়সে শিশুদের মাঠে খেলে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সে তাদের আবারও মুখস্থ বিদ্যার লড়াইয়ে নামতে হবে কি না—এখন সেটাই বড় প্রশ্ন।