০৫:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে ‘অপারেশন পার্সিয়ান স্টর্মঃ

ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে ভয়াবহ হামলা, খামেনির মৃত্যুতে চরম উত্তেজনায় বিশ্ব

হক বার্তা ডেস্ক রিপোর্টঃ
  • আপডেট সময়ঃ ১১:৫০:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬
  • / ২ বার পড়া হয়েছে।

‎মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের সূচনা করে ইরানের ওপর ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। 

শনিবার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে পরিচালিত এই সমন্বিত অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। 

দীর্ঘ চার দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা খামেনির পতনের মধ্য দিয়ে তেহরানের দীর্ঘস্থায়ী শাসনের অবসান ঘটল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

এই অভিযানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের দুই ‘অস্বাভাবিক মিত্র’- ইসরাইল এবং সৌদি আরবের সপ্তাহব্যাপী দীর্ঘ ও গোপন প্রচেষ্টার তথ্য উঠে এসেছে।

গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসনকে এই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে দীর্ঘ সময় ধরে উদ্বুদ্ধ করে আসছিলেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।

‎নেপথ্যে রিয়াদ ও তেল আবিবের ভূমিকাঃ

‎যদিও সৌদি আরব প্রকাশ্যে কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলে আসছিল, তবে তলে তলে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত এক মাসে ট্রাম্পকে একাধিক ব্যক্তিগত ফোন কলের মাধ্যমে সামরিক হামলার পক্ষে জোরালো সমর্থন দিয়েছেন।

সূত্রের দাবি, যুবরাজ ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে- এখন হামলা না করলে ইরান ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব রুখতে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য আন্তর্জাতিক মহলে প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন।

 

‎উল্লেখ্য যে, জানুয়ারিতে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খালিদ বিন সালমান ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি ইরানকে ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তবে সৌদি আরব শর্ত দিয়েছিল যে, হামলার জন্য তাদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করা যাবে না।

‎হামলার কারণ ও ট্রাম্পের কঠোর বার্তাঃ

‎প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই হামলার যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে ১৯৭৯ সালের তেহরান দূতাবাস জিম্মি সংকট, ১৯৮৩ সালে বৈরুতে মার্কিন ব্যারাকে হামলা এবং ২০০০ সালে ইয়েমেনে ‘ইউএসএস কোল’ জাহাজে হামলার মতো ঐতিহাসিক সংঘাতগুলোকে সামনে এনেছেন। তিনি দাবি করেন, এই অভিযান মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে কয়েক দশকের ইরানি আগ্রাসনের উপযুক্ত প্রতিশোধ।

‎হামলার পর এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানি জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন: “তোমরা দীর্ঘকাল ধরে যা চেয়েছিলে, আমি আজ তাই করেছি। তোমরা এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট পেয়েছ, যে তোমাদের চাওয়া পূরণ করছে। এখন দেখা যাক তোমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাও।”

‎পরিবর্তিত মার্কিন নীতি ও গোয়েন্দা মূল্যায়নঃ

‎ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের গত কয়েক দশকের পররাষ্ট্রনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত। সাধারণত পেন্টাগন কোনো দেশের সরাসরি সরকার পরিবর্তনের (Regime Change) উদ্দেশ্যে পূর্ণাঙ্গ অভিযান চালাতে দ্বিধা করত।

এমনকি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ইরানের সামরিক শক্তি আগামী এক দশকের মধ্যে মার্কিন মূল ভূখণ্ডের জন্য কোনো সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য নিয়ে ব্যাপক বিমান অভিযানের নির্দেশ দেন।

 

‎পাল্টা হামলা ও আঞ্চলিক সংঘাতের শঙ্কাঃ

‎হামলার প্রথম ঘণ্টার মধ্যেই খামেনির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে রণদামামা বেজে ওঠে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান সৌদি আরবের ওপর পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

রিয়াদ তাৎক্ষণিকভাবে এই হামলার নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইরানের বিরুদ্ধে ‘প্রয়োজনীয় ও সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। শিয়া শাসিত ইরান এবং সুন্নি প্রধান সৌদি আরবের মধ্যকার এই দীর্ঘদিনের শত্রুতা এখন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

‎ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অস্পষ্টতাঃ

‎হামলার সময় ট্রাম্প ইরানের অভ্যন্তরীণ বিরোধীদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন যে, তারা যেন এখন তাদের সরকারের “নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ” করে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ বাহিনী জনগণের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশকে শান্তি ও মর্যাদার পথে ফিরিয়ে আনবে।

তবে অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থা বা ক্ষমতার শূন্যতা পূরণে ওয়াশিংটনের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

‎প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের শান্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত থাকবে। এই ঘটনাপ্রবাহের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সমীকরণ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

 

‎তথ্যসহায়তাঃমানবজমিন

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

মধ্যপ্রাচ্যে ‘অপারেশন পার্সিয়ান স্টর্মঃ

ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে ভয়াবহ হামলা, খামেনির মৃত্যুতে চরম উত্তেজনায় বিশ্ব

আপডেট সময়ঃ ১১:৫০:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

‎মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের সূচনা করে ইরানের ওপর ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। 

শনিবার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে পরিচালিত এই সমন্বিত অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। 

দীর্ঘ চার দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা খামেনির পতনের মধ্য দিয়ে তেহরানের দীর্ঘস্থায়ী শাসনের অবসান ঘটল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

এই অভিযানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের দুই ‘অস্বাভাবিক মিত্র’- ইসরাইল এবং সৌদি আরবের সপ্তাহব্যাপী দীর্ঘ ও গোপন প্রচেষ্টার তথ্য উঠে এসেছে।

গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসনকে এই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে দীর্ঘ সময় ধরে উদ্বুদ্ধ করে আসছিলেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।

‎নেপথ্যে রিয়াদ ও তেল আবিবের ভূমিকাঃ

‎যদিও সৌদি আরব প্রকাশ্যে কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলে আসছিল, তবে তলে তলে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত এক মাসে ট্রাম্পকে একাধিক ব্যক্তিগত ফোন কলের মাধ্যমে সামরিক হামলার পক্ষে জোরালো সমর্থন দিয়েছেন।

সূত্রের দাবি, যুবরাজ ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে- এখন হামলা না করলে ইরান ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব রুখতে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য আন্তর্জাতিক মহলে প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন।

 

‎উল্লেখ্য যে, জানুয়ারিতে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খালিদ বিন সালমান ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি ইরানকে ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তবে সৌদি আরব শর্ত দিয়েছিল যে, হামলার জন্য তাদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করা যাবে না।

‎হামলার কারণ ও ট্রাম্পের কঠোর বার্তাঃ

‎প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই হামলার যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে ১৯৭৯ সালের তেহরান দূতাবাস জিম্মি সংকট, ১৯৮৩ সালে বৈরুতে মার্কিন ব্যারাকে হামলা এবং ২০০০ সালে ইয়েমেনে ‘ইউএসএস কোল’ জাহাজে হামলার মতো ঐতিহাসিক সংঘাতগুলোকে সামনে এনেছেন। তিনি দাবি করেন, এই অভিযান মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে কয়েক দশকের ইরানি আগ্রাসনের উপযুক্ত প্রতিশোধ।

‎হামলার পর এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানি জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন: “তোমরা দীর্ঘকাল ধরে যা চেয়েছিলে, আমি আজ তাই করেছি। তোমরা এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট পেয়েছ, যে তোমাদের চাওয়া পূরণ করছে। এখন দেখা যাক তোমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাও।”

‎পরিবর্তিত মার্কিন নীতি ও গোয়েন্দা মূল্যায়নঃ

‎ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের গত কয়েক দশকের পররাষ্ট্রনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত। সাধারণত পেন্টাগন কোনো দেশের সরাসরি সরকার পরিবর্তনের (Regime Change) উদ্দেশ্যে পূর্ণাঙ্গ অভিযান চালাতে দ্বিধা করত।

এমনকি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ইরানের সামরিক শক্তি আগামী এক দশকের মধ্যে মার্কিন মূল ভূখণ্ডের জন্য কোনো সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য নিয়ে ব্যাপক বিমান অভিযানের নির্দেশ দেন।

 

‎পাল্টা হামলা ও আঞ্চলিক সংঘাতের শঙ্কাঃ

‎হামলার প্রথম ঘণ্টার মধ্যেই খামেনির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে রণদামামা বেজে ওঠে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান সৌদি আরবের ওপর পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

রিয়াদ তাৎক্ষণিকভাবে এই হামলার নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইরানের বিরুদ্ধে ‘প্রয়োজনীয় ও সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। শিয়া শাসিত ইরান এবং সুন্নি প্রধান সৌদি আরবের মধ্যকার এই দীর্ঘদিনের শত্রুতা এখন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

‎ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অস্পষ্টতাঃ

‎হামলার সময় ট্রাম্প ইরানের অভ্যন্তরীণ বিরোধীদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন যে, তারা যেন এখন তাদের সরকারের “নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ” করে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ বাহিনী জনগণের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশকে শান্তি ও মর্যাদার পথে ফিরিয়ে আনবে।

তবে অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থা বা ক্ষমতার শূন্যতা পূরণে ওয়াশিংটনের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

‎প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের শান্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত থাকবে। এই ঘটনাপ্রবাহের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সমীকরণ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

 

‎তথ্যসহায়তাঃমানবজমিন