০৪:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

ধোপাজান-চলতী নদীতে অনুমোদনের নামে বালু লুটের মহোৎসব: আদালতে মামলা দায়ের

স্টাফ রিপোর্টারঃ
  • আপডেট সময়ঃ ১০:২৬:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৫
  • / ৮৮ বার পড়া হয়েছে।

‎সুনামগঞ্জের ধোপাজান-চলতী নদীতে চলছে বালু লুটের মহোৎসব। দিন-রাত জুড়ে ড্রেজার ও বোমা মেশিনের মাধ্যমে নদীর বালু তোলা হচ্ছে নির্বিচারে। 

‎সরকার অনুমোদিত “ভিট বালু” তোলার কাগজ দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং নদী থেকে উত্তোলন করছে মূল্যবান সিলিকা বালু, যা দেশের খনিজ সম্পদ হিসেবে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন।

‎স্থানীয়দের অভিযোগ, বিআইডব্লিউটিএ’র অনুমতির শর্ত ভঙ্গ করে প্রতিষ্ঠানটি টোকেনের বিনিময়ে এসব বালু বিক্রি করছে ব্যবসায়ীদের কাছে। এর ফলে নদীপাড়ের শত শত বাড়ি-ঘর, ফসলি জমি ও বাঁধ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

‎বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) আদালতে এ ঘটনায় মামলা দায়ের করেছেন সুনামগঞ্জ পৌরসভার দক্ষিণ আরপিননগর এলাকার বাসিন্দা মো. গোলাম হোসেন।

‎মামলাটি আমলগ্রহণকারী জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, বিশ্বম্ভরপুর, সুনামগঞ্জ-এ দায়ের করা হয়। বাদী পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন আইনজীবী মো. নাজমুল হুদা।

‎মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং ভিটবালু উত্তোলনের অনুমতি নিলেও, তারা নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে নদীর তলদেশ ও পাড় কেটে বালু তুলছে। বাদীর মালিকানাধীন জমি থেকেও তারা অবৈধভাবে প্রায় ৫ কোটি টাকার বালু বিক্রি করেছে বলে মামলায় দাবি করা হয়। এতে বাদীর তিন বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

‎বাদী মো. গোলাম হোসেন বলেন, “নদীর পাড়ে আমার আমন জমি ছিল। ২৭ অক্টোবর রাতে তারা ড্রেজার বসায়, প্রায় ৭০ জন লোকসহ। আমি বাধা দিলে উল্টো হুমকি দেয়। এখন আমার তিন বিঘা জমি নদীতে গেছে। তাই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি।”

‎মামলার আইনজীবী নাজমুল হুদা জানান, “লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং ভিটবালু তুলার কথা ছিল, কিন্তু তারা সিলিকা বালু তুলছে। বাদীর জায়গা থেকে ৫ কোটি টাকার বেশি বালু নিয়ে গেছে তারা। আদালত মামলা আমলে নিয়ে সদর থানার ওসিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।”

‎মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা চলতী নদীর মুখেই সুনামগঞ্জের একমাত্র বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারি ধোপাজান। ২০১৮ সালে পরিবেশ ও জীবিকা রক্ষায় আদালত এই কোয়ারি থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ করেন।

‎তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আবারও শুরু হয় বালু উত্তোলনের হরিলুট। একাধিক অভিযোগে তৎকালীন এসপি আনোয়ার হোসেনকে প্রত্যাহার করা হলেও পরে প্রশাসনের তৎপরতায় কিছুদিন বন্ধ থাকে ড্রেজার কার্যক্রম।

‎কিন্তু সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মাত্র ১ কোটি টাকা রাজস্বের বিপরীতে ১ কোটি ২১ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয়। এই সুযোগেই লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং নদীর বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার বসিয়ে ব্যাপক বালু উত্তোলন শুরু করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

(ফাইল ফটো)

‎স্থানীয়রা জানান, অনুমতি পাওয়ার পর থেকেই নদীর দুই তীরে ফসলি জমি, বসতভিটা, কবরস্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ নানা স্থাপনা ভাঙনের মুখে পড়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে তারা বারবার প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

‎উল্লেখ্য, ধোপাজান-চলতী নদীর এই বালু উত্তোলন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

‎পরিবেশবিদরা বলছেন, এভাবে ড্রেজার ও বোমা মেশিন চালিয়ে বালু তোলা চলতে থাকলে পুরো নদী ব্যবস্থাই অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

ধোপাজান-চলতী নদীতে অনুমোদনের নামে বালু লুটের মহোৎসব: আদালতে মামলা দায়ের

আপডেট সময়ঃ ১০:২৬:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৫

‎সুনামগঞ্জের ধোপাজান-চলতী নদীতে চলছে বালু লুটের মহোৎসব। দিন-রাত জুড়ে ড্রেজার ও বোমা মেশিনের মাধ্যমে নদীর বালু তোলা হচ্ছে নির্বিচারে। 

‎সরকার অনুমোদিত “ভিট বালু” তোলার কাগজ দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং নদী থেকে উত্তোলন করছে মূল্যবান সিলিকা বালু, যা দেশের খনিজ সম্পদ হিসেবে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন।

‎স্থানীয়দের অভিযোগ, বিআইডব্লিউটিএ’র অনুমতির শর্ত ভঙ্গ করে প্রতিষ্ঠানটি টোকেনের বিনিময়ে এসব বালু বিক্রি করছে ব্যবসায়ীদের কাছে। এর ফলে নদীপাড়ের শত শত বাড়ি-ঘর, ফসলি জমি ও বাঁধ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

‎বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) আদালতে এ ঘটনায় মামলা দায়ের করেছেন সুনামগঞ্জ পৌরসভার দক্ষিণ আরপিননগর এলাকার বাসিন্দা মো. গোলাম হোসেন।

‎মামলাটি আমলগ্রহণকারী জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, বিশ্বম্ভরপুর, সুনামগঞ্জ-এ দায়ের করা হয়। বাদী পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন আইনজীবী মো. নাজমুল হুদা।

‎মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং ভিটবালু উত্তোলনের অনুমতি নিলেও, তারা নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে নদীর তলদেশ ও পাড় কেটে বালু তুলছে। বাদীর মালিকানাধীন জমি থেকেও তারা অবৈধভাবে প্রায় ৫ কোটি টাকার বালু বিক্রি করেছে বলে মামলায় দাবি করা হয়। এতে বাদীর তিন বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

‎বাদী মো. গোলাম হোসেন বলেন, “নদীর পাড়ে আমার আমন জমি ছিল। ২৭ অক্টোবর রাতে তারা ড্রেজার বসায়, প্রায় ৭০ জন লোকসহ। আমি বাধা দিলে উল্টো হুমকি দেয়। এখন আমার তিন বিঘা জমি নদীতে গেছে। তাই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি।”

‎মামলার আইনজীবী নাজমুল হুদা জানান, “লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং ভিটবালু তুলার কথা ছিল, কিন্তু তারা সিলিকা বালু তুলছে। বাদীর জায়গা থেকে ৫ কোটি টাকার বেশি বালু নিয়ে গেছে তারা। আদালত মামলা আমলে নিয়ে সদর থানার ওসিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।”

‎মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা চলতী নদীর মুখেই সুনামগঞ্জের একমাত্র বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারি ধোপাজান। ২০১৮ সালে পরিবেশ ও জীবিকা রক্ষায় আদালত এই কোয়ারি থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ করেন।

‎তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আবারও শুরু হয় বালু উত্তোলনের হরিলুট। একাধিক অভিযোগে তৎকালীন এসপি আনোয়ার হোসেনকে প্রত্যাহার করা হলেও পরে প্রশাসনের তৎপরতায় কিছুদিন বন্ধ থাকে ড্রেজার কার্যক্রম।

‎কিন্তু সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মাত্র ১ কোটি টাকা রাজস্বের বিপরীতে ১ কোটি ২১ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয়। এই সুযোগেই লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং নদীর বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার বসিয়ে ব্যাপক বালু উত্তোলন শুরু করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

(ফাইল ফটো)

‎স্থানীয়রা জানান, অনুমতি পাওয়ার পর থেকেই নদীর দুই তীরে ফসলি জমি, বসতভিটা, কবরস্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ নানা স্থাপনা ভাঙনের মুখে পড়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে তারা বারবার প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

‎উল্লেখ্য, ধোপাজান-চলতী নদীর এই বালু উত্তোলন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

‎পরিবেশবিদরা বলছেন, এভাবে ড্রেজার ও বোমা মেশিন চালিয়ে বালু তোলা চলতে থাকলে পুরো নদী ব্যবস্থাই অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে।