০৬:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

“আমার বন্ধু ইলন মাস্ক” ——- ডাঃ নুরুল ইসলাম 

ডাঃ নুরুল ইসলাম
  • আপডেট সময়ঃ ০৯:০৬:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / ১১৮ বার পড়া হয়েছে।

সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান, মানবিক চিকিৎসক জনাব নুরুল ইসলাম-এর ফেসবুক পোস্ট-টি হুবহু প্রকাশ করা হলো।

ছোটগল্প —–

             “আমার বন্ধু ইলন মাস্ক”

  ডাঃ নুরুল ইসলাম 

প্রাইমারি স্কুল জীবনে আমার এক ক্লাশবন্ধু আছে। তার পেশা গ্রাম থেকে শহরে এসে শাক-সবজি ফেরি করে বিক্রি করা। আমার সাথে তার পড়ার সময়কাল মাত্র দুই বছর। তারপর পড়ালেখা ছেড়ে কোথায় যে সে হারিয়ে গেলো, খবর রাখার প্রয়োজন দেখা দেয়নি আর কখনো।

সে ক্লাশ মিস করতো প্রচুর। মাঝেমধ্যে স্কুলে আসতো। তবে আমার সাথে ভালো একটা সখ্যতা ছিলো তার। ফুটবল পাগল এক বালক ছিলো সে।

আজ থেকে ৩৩ বছর আগের কথা বলছি। দারিদ্রসীমার নিন্মে যাদের বাস, সময়ের পরিক্রমায় কে কোথায় যাচ্ছে কিংবা হারিয়ে যাচ্ছে, কিংবা মরে যাচ্ছে তার খবর, তাদের খবর মহাকালের মানুষ কখনোই মনে রাখে না, রাখবেও না। আমিও তার ব্যতিক্রম নই।

বন্ধুটির নাম সঙ্গতো কোন এক কারনে প্রকাশ করছি না। ধরুন তার নাম ইলন মাস্ক।

আজ থেকে প্রায় ১০ বছর আগে ইলন মাস্কের সাথে আমার দেখা। একদিন হঠাৎ দেখি সুনামগঞ্জ শহরের কোন এক কানাগলিতে ইলন মাস্ক কাঁধের দুপাশে ভর করা দুই সবজির পাতি নিয়ে ক্রেতা আকর্ষণের জন্য হেঁকে বেড়াচ্ছিলো।

আমি ছিলাম মোটরবাইকে। ইলনকে চিনতে আমার মোটেও এক মুহূর্ত চিন্তা করতে হয়নি। যদিও অতিরিক্তি কায়িক শ্রম আর ঘর্মাক্ত মুখয়াভে বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট ছিলো তার সমস্ত শরীর জুড়ে।

হাঁকাহাঁকির এক পর্যায়ে আমি তাকে থামালাম। আমার সবজি কেনার দরকার ছিলো না। তারপরও কয়েক প্রকারের সবজি কিনতে কিনতে আমি একের পর এক তাকে প্রশ্ন করে যাচ্ছিলাম। “বাড়ি কোথায়? লেখাপড়া করেছে কি না? ছেলে-মেয়ে কয়জন?” ইত্যাদি নানাবিধ প্রশ্ন।

না, আমার ভুল হয়নি। এয়েই সেই ইলন! আমার ক্লাশম্যাট ইলন, আমার শৈশব বন্ধু ইলন!

মনেমনে প্রশ্ন জাগ্রত হলো, বয়স ব্যবধানে কিংবা সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষ কি মানুষকে এমনি এমনিতেই ভুলে যায়? নাকি ভুলে যাওয়ার ভান করে থাকে? কিংবা সত্যিই মহাকালের স্মৃতির অতল গহব্বরে চেনামুখ, চেনাচোখ চিরজীবনের জন্য চিরদিনের তরে বিস্মৃতির অতল সাগরে তলিয় যায়।

নিজে অযথাচিত হয়ে আমিও সেদিন ইলন মাস্ককে নিজের পরিচয় দিলাম না। আমি চাইছিলাম ইলন নিজেই তার পরিচয় তুলে ধরে আমাকে জড়িয়ে ধরুক।

আমি সবজির দামদর নিয়ে দর কষাকষি করছিলাম। সে কেমন যেনো আনমনে আমার দরই মেনে নিলো। কিন্তু নিজ থেকে কিছুই বললো না।

তারপর দশ বছর কেটে গেলো! ইলনের সাথে আমার আর দেখা হয়নি।

গতো কিছুদিন আগে ভরা পূর্ণীমার এক দুধের মতো ধবল জোছনায় নেশাগ্রস্ত হয়ে আমি আমার এলাকার পথে প্রান্তরে একা একা হেঁটে বেড়াচ্ছিলাম। কাঁচা-পাকা বিভিন্ন গ্রাম্য প্রান্তর পথ পাড়ি দিয়ে হঠাৎ ইলন মাস্কের বাড়ির সামনে এসে হাজির হলাম।

তখন রাত ১১টার উপরে বাজে। এক পথচারী থেকে জানতে পারলাম ইলন মাস্ক সেই গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে পাড়ি জমিয়ে সংসার পেতেছে প্রায় এক যুগ আগে। অন্য গ্রামে ইলন মাস্কের বাড়ির সহীহ্ ঠিকানা সংগ্রহ করে আমি গ্রামের নির্জনতাকে সঙ্গী করে অপূূর্ব অনন্য বর্ণানাতীত প্রাকৃতিক নৈসর্গিক ভরা পূর্ণীমার জোছনাকে পুরো গায়ে আবৃষ্ট করে হেঁটে যাচ্ছিলাম এদিক সেদিক হয়ে।

ইলন মাস্কের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়েছিলাম আমি। চারিদিক ঝোঁপঝাঁড় পরিবেষ্টিত একটি দো-চালা টিনের ঘর। ভরা পূর্ণীমার আলোতে চারপাশ প্রায় দিনের মতোই ফঁকফঁকা।

মেঘমুক্ত বর্ষাকালের পূর্ণীমার আলাদা একটা সৌন্দর্য্য, আলেদা একটা রুপ, আলাদা একটা মায়া, আলাদা একটা প্রাকৃতিক নৈসর্গিকতা থাকে, যা হৃদয় দিয়ে উপলদ্ধি করা যায়, হৃদয়াঙ্গম করা যায় কিন্তু লেখনি শক্তি বর্ণনা বা বোধশক্তি দিয়ে প্রকাশ করার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা মানুষকে দেয়নি!

সেদিন বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে ছিলো। এতো রাতে ইলন মাস্ককে ডেকে তুলা ঠিক হবে কি না, বুঝতে পারছিলাম না। মনের সায় না থাকা সত্ত্বেও ডাকলাম-

-”ইলন কি বাড়িতে আছে?”

কোন সাড়া-শব্দ নেই। আমি দ্বিতীয় বার কন্ঠের স্বর একটু বাড়িয়ে বললাম-

-“ইলন কি বাড়িতে আছে?”

ঘর থেকে মেয়েলী একটড কন্ঠস্বর ভেসে আসলো-

-“আছে। আমনে কেডা?”

-“আমার বাড়ি কোনাগাঁও। ইলনের সাথে একটু কথা বলতে চাই।” মেয়েলী কন্ঠস্বরে একটু থতমতো খেয়ে আমি প্রতিউত্তর দিলাম।

-“উনি ঘুমাইয়া গেছে। ডাইক্কা দিতাছি।”

রাত তখন প্রায় ১২টার কাটা পার হয়ে গিয়েছিলো। অর্থ্যাৎ রাত্রির তৃতীয় প্রহর শুরু হলো। গরমকাল হলেও চারপাশ মৃদু বাতাস আর সবুজ গাছপালার কারনে শীতল শীতল একটা ভাব বেশ অনুভব করতেছিলাম।

পড়নে লুঙ্গি আর গায়ে গামছা পেছিয়ে ইলন আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমাকে দেখে একটু ভয় পেলো বোধ হয়। বললো-

-“এতো রাইতে আপনি?”

-“রাস্তা দিয়ে হাঁটহাঁটি করতে ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো তোমাকে দেখে যাই। আমাকে কি তুমি চিনতে পারছো?’ আমি বললাম।

-“আরে আমনেরে কেডায় না চিনে? নুরু ডাক্তার না আমনে?”

-“আর কোন পরিচয় নাই আমার? তোমার প্রাইমারী স্কুলের কথা মনে নাই ইলন?”

আমার কথা শুনে ইলন কেমন যেনো হয়ে গেলো। বললো-

-” আমিতো বেশিদিন পড়ি নাই। সবকিছু মনে করতে পারতেছি না। তবে হুনছি এক কেলাশম্যাট নাকি বড় ডাক্তার অইছে।”

-“ইলন আমি নুরুল হক। ক্লাশে আমার রোল নাম্বার ছিলো এক। মনে পড়ে না তোমার?”

দেখলাম চান্দের আলোতে ইলনের মুখ একপ্রকার আনন্দে কেমন যেনো চিকচিক করছে। হঠাৎ বলে উঠলো-

-” নুরু?”

তুই! সম্বোধনটায় বেশ ভালো লাগলো আমার। যাক ইলন তাহলে আমারে ভুলে নাই।

-“আমি মনে করছিলাম..” বলেই ঘরের দিকে চেয়ার আনতে যেতে চাইলে আমিও দ্রুত তুইতে নেমে আসলাম এবং বললাম-

-“কিচ্ছুর দরকার নাইরে ইলন। সমস্যা না থাকলে চল উন্মুক্ত ঐ মাঠে কিছুক্ষণ গিয়ে বসি।

চাঁদনী পশর রাত। ভরা পূর্ণীমার আলোতে দুধেল চাদরে ছেয়ে আছে চারপাশ। দূর কোথায়ও একটি নির্জন বন থেকে একাকী একটি শীল্লা পাখির ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম। শীল্লা পাখির কন্ঠে কেমন যেনো একটা সঙ্গীহারা কাতরতা ফুটে উঠছিলো।

বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে উন্মুক্ত মাঠের একটি পতিত জমির উঁচু আলে বসলাম আমি আর ইলন।

কতোদিন পর এক সাথে বসা! ৩৩ বছর! আহারে জীবন!

হঠাৎ খচখচ একটা শব্দ কানে ভেসে আসলো। প্রথম একটি, তারপর দুটি, তিনটি তারপর একঝাঁক শিয়াল বাচ্চা-কাচ্চা, ছাও-পোনাসহ আমাদের বসার ঠিক কাছাকাছি দূরের উঁচু একটি জমির আলে জড়ো হয়ে হুক্কাহুয়া রবে রাত্রির তৃতীয় প্রহরের চূড়ান্ত ঘন্টাধ্বনী বাজিয়ে দিয়ে গেলো।

রাতের বিভিন্ন প্রহরের বিভিন্ন সৌন্দর্য্য ফুটে উঠে। রাতের চার প্রহরে বিভিন্ন নিশাচর প্রাণীরা একসাথে জেগে উঠেনা। ভিন্ন ভিন্ন প্রহরে ভিন্ন ভিন্ন প্রাণী জেগে উঠে, খাবারের খোঁজ করে। রাতও বিভিন্ন নিশাচর প্রাণী, প্রকৃতির রহস্যময় খেলাও সৌন্দর্য্যকে কেন্দ্র করে প্রহর ভিত্তিক এক এক রুপ ধারন করে।

ঝিঁঝিঁ পোকাদের ডাকে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছিলো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য আমি ইলনকে বললাম-

-‘”বিড়ি-টিড়ি খাস নাকিরে ইলন?”

-“হু!” লাজুক ভঙ্গিতে জবাব দিলো ইলন।

-হু কিরে? বিড়ি ধরা।”

কোমড়ের কাছে লুঙ্গির প্যাচে গুজে রাখা বিড়ির বান বের করলো ইলন। সে কিছুটা লজ্জ্বা পাচ্ছিলো। আমি চিকিৎসক মানুষ। আমার সামনে বিড়ি খাওয়াটা তার কাছে বিরাট এক অপরাধ সমান বিষয় মনে হলো। বললাম-

-“আমারেও একটা দে।”

আমার কথা শুনে হঠাৎ আকাশ থেকে যেনো মাটিতে পড়লো ইলন। বললো-

-“তুই বিড়ি খাস নাকি? তুই না ডাক্তার!”

-“খাই মাঝেমধ্যে। ম্যাচটা দে।”

পাতার বিড়ি। এলাকায় এগুলো ইন্ডিয়ান বিড়ি হিসাবে পরিচিত। চান্দের আলোতে দেখলাম নিশ্চিন্ত মনে মহা আনন্দে বিড়ি টেনে চলেছিলো ইলন।

-“তর মনে আছে ইলন, লেংটা হয়ে ফুটবল খেলার জন্য হাবিবউল্লাহ স্যার কী মাইরটা না দিয়েছিলো স্কুলে!”

ইলন বললো, তার বেশ মনে আছেরে।

-“বেশি মারছিলো আমারে।কাঁচা জিংলার বাড়ি, হাত দাগ পইড়া গেছিলো!”

রাতের প্রহর বেড়ে চলছিলো। আমাদের শৈশবের কতো স্মৃতি যে সেদিন হারিয়ে যাওয়া মহাকালের অতল গহব্বর থেকে জলজ্যান্ত হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠেছিলো। আমরা সমস্ত দেয়াল ভেঙ্গেচুড়ে যেনো শৈশবের একাত্মা হয়ে গল্পে মেতে উঠলাম।

সেদিন আমাদের উপর ভরাপূর্ণীমার জোছনা সমানভাবেই দুধেল চাদরের মতো আবৃত করে ঘিরে রেখেছিলো। প্রকৃতির এই খেলাটা দারুণ! কারো প্রতিই প্রকৃতির আলাদা কোন দেয়াল নাই, একচোখা কোন রীতি নাই, বন্টনে কোন কার্পণ্যবোধ নাই, বিচারে কোন অবিচার নাই।

আরেকটা পাতার বিড়ি ধরালো ইলন। জানতে চাইলে বললো তার দুই ছেলে, দুই মেয়ে। তার বাবা মারা গেছে কয়েব বছর আগে। মা তার সাথেই থাকে। মেয়েটা সবচেয়ে বড়। কর্মঠ ছেলে দেখে বিয়ে দিয়েছে আজ প্রায় দুই বছর হলো।

কথার এক ফাঁকে ইলন কে আমি বললাম-

-“বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধনীকে জানস?”

আমার প্রশ্নে ইলন কিছুটা ইতস্তত হলো। অপরাগ কন্ঠে বললো, সে চিনে না। আরো বললো সংসারের ঘানি টানতে টানতেই, কখন তার দিন আসে, কখন তার রাত আসে, তারই হিসাব রাখা যার পক্ষে কঠিন, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী লোকটাকে চিনে তার কি লাভ।

দশ বছর আগে শহরের একগলিতে তাকে যে কর্মে ব্যস্ত দেখেছিলাম, তার ব্যবসা ঐটাই। বিকালে গ্রামের বাজারে বাজারে ঘুরে সবজি সংগ্রহ করা এবং ভোরে সেই সবজি নিয়ে শহরপানে ফেরি করে বিক্রির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া।

খুবই ন্যায্য কথা। তারপরেও আমি নিজ থেকেই তাকে বললাম-

-“পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী লোকের নাম হলো ইলন মাস্ক। সে আমেরিকায় থাকে।”

ইলনের এই বিষয়ে কোন বিকার দেখলাম না।

আকাশে ভরা পূর্ণীমার সাথে তারকারাজির মেলা বসেছিলো। রাত বেড়ে চলছিলো। আমাদের আলাপচারিতায় নির্জন পরিবেশ যেনো অনন্য হয়ে উঠলো।

আলাপচারিতায় সংসারের গল্প করতে করতে এক সময় দেখলাম ইলনের মন একটু খারাপ হয়ে গেলো। আমি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে বিদায় নেয়ার জন্য বললাম-

-“পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী লোকের যে আকাশ,বাতাস, চাঁদ, সুরুজ, আমার আর তরও কিন্তু সেই একই আকাশ, বাতাস, চাঁদ, সুরুজ।”

আমার কথা শুনে ইলন খানিকটা হাসলো। বললো-

-“তুই যে এতোদিন পর আমারে খুঁজে বের করলি, এতেই আমি আইজ মহাখুশি। বাদ দে এসব কথা।”

-” দশ বছর আগে একবার তর সাথে দেখা হয়েছিলো আমার, আমি সবজি কিনেছিলাম তর কাছ থেকে, মনে আছে?”

ইলন বললো মনে আছে। কিন্তু পরিচয় দেয়নি

-“যদি আমি না চিনি?”

-“যদি আমি না চিনি?”

কিংবা চিনেও যদি না চেনার ভান করি। বিষয়টা আমাকে কিছুটা হলেও বিকারগ্রস্থ করে তুললো। সত্যিই তো!

রাতের তৃতীয় প্রহর প্রায় শেষ। আমাকে গন্তব্যে পৌঁছাতে পাঁচ-সাত গ্রাম পাড়ি দিতে হবে। কোলাকুলির পর ইলন আমাকে এগিয়ে দেয়ার প্রস্তাব করলে, আমি না করে দিয়ে মেঠোপথ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম।

ধবল জোছনার সাথে আমার ছায়া আমার সাথে হেঁটে চলছিলো। হৃদয় মস্তিষ্ক জুড়ে একটি সত্যি আমাকে পথে পথে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিলো-“যদি আমি না চিনি?”

 

 

হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো-

-“এই পৃথিবীর পুরো মানব সভ্যতাই দেয়ালের পর দেয়াল দিয়ে আলাদা হয়ে আছে। শিক্ষা-শিক্ষায় দেয়াল, সনদ-সনদে দেয়াল, অর্থ-বিত্তের দেয়াল, পেশায়-পেশায় দেয়াল, গোত্রে-গোত্রে দেয়াল, বিশ্বাস-বিশ্বাসে দেয়াল, ধর্ম-ধর্মে দেয়াল, দেশে-দেশে দেয়াল, স্থান-কাল-পাত্রভেদে দেয়াল, জাতে-জাতে দেয়াল, পাতে-পাতে দেয়াল, কালো দেয়াল, সাদা দেয়াল? কতো কতো দেয়াল? চারিদিকে শুধু দেয়াল আর দেয়াল- মানুষকে আলাদা করার কতো সব দেয়াল!

এই দেয়াল ভাঙবে কে?

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

“আমার বন্ধু ইলন মাস্ক” ——- ডাঃ নুরুল ইসলাম 

আপডেট সময়ঃ ০৯:০৬:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫

সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান, মানবিক চিকিৎসক জনাব নুরুল ইসলাম-এর ফেসবুক পোস্ট-টি হুবহু প্রকাশ করা হলো।

ছোটগল্প —–

             “আমার বন্ধু ইলন মাস্ক”

  ডাঃ নুরুল ইসলাম 

প্রাইমারি স্কুল জীবনে আমার এক ক্লাশবন্ধু আছে। তার পেশা গ্রাম থেকে শহরে এসে শাক-সবজি ফেরি করে বিক্রি করা। আমার সাথে তার পড়ার সময়কাল মাত্র দুই বছর। তারপর পড়ালেখা ছেড়ে কোথায় যে সে হারিয়ে গেলো, খবর রাখার প্রয়োজন দেখা দেয়নি আর কখনো।

সে ক্লাশ মিস করতো প্রচুর। মাঝেমধ্যে স্কুলে আসতো। তবে আমার সাথে ভালো একটা সখ্যতা ছিলো তার। ফুটবল পাগল এক বালক ছিলো সে।

আজ থেকে ৩৩ বছর আগের কথা বলছি। দারিদ্রসীমার নিন্মে যাদের বাস, সময়ের পরিক্রমায় কে কোথায় যাচ্ছে কিংবা হারিয়ে যাচ্ছে, কিংবা মরে যাচ্ছে তার খবর, তাদের খবর মহাকালের মানুষ কখনোই মনে রাখে না, রাখবেও না। আমিও তার ব্যতিক্রম নই।

বন্ধুটির নাম সঙ্গতো কোন এক কারনে প্রকাশ করছি না। ধরুন তার নাম ইলন মাস্ক।

আজ থেকে প্রায় ১০ বছর আগে ইলন মাস্কের সাথে আমার দেখা। একদিন হঠাৎ দেখি সুনামগঞ্জ শহরের কোন এক কানাগলিতে ইলন মাস্ক কাঁধের দুপাশে ভর করা দুই সবজির পাতি নিয়ে ক্রেতা আকর্ষণের জন্য হেঁকে বেড়াচ্ছিলো।

আমি ছিলাম মোটরবাইকে। ইলনকে চিনতে আমার মোটেও এক মুহূর্ত চিন্তা করতে হয়নি। যদিও অতিরিক্তি কায়িক শ্রম আর ঘর্মাক্ত মুখয়াভে বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট ছিলো তার সমস্ত শরীর জুড়ে।

হাঁকাহাঁকির এক পর্যায়ে আমি তাকে থামালাম। আমার সবজি কেনার দরকার ছিলো না। তারপরও কয়েক প্রকারের সবজি কিনতে কিনতে আমি একের পর এক তাকে প্রশ্ন করে যাচ্ছিলাম। “বাড়ি কোথায়? লেখাপড়া করেছে কি না? ছেলে-মেয়ে কয়জন?” ইত্যাদি নানাবিধ প্রশ্ন।

না, আমার ভুল হয়নি। এয়েই সেই ইলন! আমার ক্লাশম্যাট ইলন, আমার শৈশব বন্ধু ইলন!

মনেমনে প্রশ্ন জাগ্রত হলো, বয়স ব্যবধানে কিংবা সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষ কি মানুষকে এমনি এমনিতেই ভুলে যায়? নাকি ভুলে যাওয়ার ভান করে থাকে? কিংবা সত্যিই মহাকালের স্মৃতির অতল গহব্বরে চেনামুখ, চেনাচোখ চিরজীবনের জন্য চিরদিনের তরে বিস্মৃতির অতল সাগরে তলিয় যায়।

নিজে অযথাচিত হয়ে আমিও সেদিন ইলন মাস্ককে নিজের পরিচয় দিলাম না। আমি চাইছিলাম ইলন নিজেই তার পরিচয় তুলে ধরে আমাকে জড়িয়ে ধরুক।

আমি সবজির দামদর নিয়ে দর কষাকষি করছিলাম। সে কেমন যেনো আনমনে আমার দরই মেনে নিলো। কিন্তু নিজ থেকে কিছুই বললো না।

তারপর দশ বছর কেটে গেলো! ইলনের সাথে আমার আর দেখা হয়নি।

গতো কিছুদিন আগে ভরা পূর্ণীমার এক দুধের মতো ধবল জোছনায় নেশাগ্রস্ত হয়ে আমি আমার এলাকার পথে প্রান্তরে একা একা হেঁটে বেড়াচ্ছিলাম। কাঁচা-পাকা বিভিন্ন গ্রাম্য প্রান্তর পথ পাড়ি দিয়ে হঠাৎ ইলন মাস্কের বাড়ির সামনে এসে হাজির হলাম।

তখন রাত ১১টার উপরে বাজে। এক পথচারী থেকে জানতে পারলাম ইলন মাস্ক সেই গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে পাড়ি জমিয়ে সংসার পেতেছে প্রায় এক যুগ আগে। অন্য গ্রামে ইলন মাস্কের বাড়ির সহীহ্ ঠিকানা সংগ্রহ করে আমি গ্রামের নির্জনতাকে সঙ্গী করে অপূূর্ব অনন্য বর্ণানাতীত প্রাকৃতিক নৈসর্গিক ভরা পূর্ণীমার জোছনাকে পুরো গায়ে আবৃষ্ট করে হেঁটে যাচ্ছিলাম এদিক সেদিক হয়ে।

ইলন মাস্কের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়েছিলাম আমি। চারিদিক ঝোঁপঝাঁড় পরিবেষ্টিত একটি দো-চালা টিনের ঘর। ভরা পূর্ণীমার আলোতে চারপাশ প্রায় দিনের মতোই ফঁকফঁকা।

মেঘমুক্ত বর্ষাকালের পূর্ণীমার আলাদা একটা সৌন্দর্য্য, আলেদা একটা রুপ, আলাদা একটা মায়া, আলাদা একটা প্রাকৃতিক নৈসর্গিকতা থাকে, যা হৃদয় দিয়ে উপলদ্ধি করা যায়, হৃদয়াঙ্গম করা যায় কিন্তু লেখনি শক্তি বর্ণনা বা বোধশক্তি দিয়ে প্রকাশ করার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা মানুষকে দেয়নি!

সেদিন বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে ছিলো। এতো রাতে ইলন মাস্ককে ডেকে তুলা ঠিক হবে কি না, বুঝতে পারছিলাম না। মনের সায় না থাকা সত্ত্বেও ডাকলাম-

-”ইলন কি বাড়িতে আছে?”

কোন সাড়া-শব্দ নেই। আমি দ্বিতীয় বার কন্ঠের স্বর একটু বাড়িয়ে বললাম-

-“ইলন কি বাড়িতে আছে?”

ঘর থেকে মেয়েলী একটড কন্ঠস্বর ভেসে আসলো-

-“আছে। আমনে কেডা?”

-“আমার বাড়ি কোনাগাঁও। ইলনের সাথে একটু কথা বলতে চাই।” মেয়েলী কন্ঠস্বরে একটু থতমতো খেয়ে আমি প্রতিউত্তর দিলাম।

-“উনি ঘুমাইয়া গেছে। ডাইক্কা দিতাছি।”

রাত তখন প্রায় ১২টার কাটা পার হয়ে গিয়েছিলো। অর্থ্যাৎ রাত্রির তৃতীয় প্রহর শুরু হলো। গরমকাল হলেও চারপাশ মৃদু বাতাস আর সবুজ গাছপালার কারনে শীতল শীতল একটা ভাব বেশ অনুভব করতেছিলাম।

পড়নে লুঙ্গি আর গায়ে গামছা পেছিয়ে ইলন আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমাকে দেখে একটু ভয় পেলো বোধ হয়। বললো-

-“এতো রাইতে আপনি?”

-“রাস্তা দিয়ে হাঁটহাঁটি করতে ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো তোমাকে দেখে যাই। আমাকে কি তুমি চিনতে পারছো?’ আমি বললাম।

-“আরে আমনেরে কেডায় না চিনে? নুরু ডাক্তার না আমনে?”

-“আর কোন পরিচয় নাই আমার? তোমার প্রাইমারী স্কুলের কথা মনে নাই ইলন?”

আমার কথা শুনে ইলন কেমন যেনো হয়ে গেলো। বললো-

-” আমিতো বেশিদিন পড়ি নাই। সবকিছু মনে করতে পারতেছি না। তবে হুনছি এক কেলাশম্যাট নাকি বড় ডাক্তার অইছে।”

-“ইলন আমি নুরুল হক। ক্লাশে আমার রোল নাম্বার ছিলো এক। মনে পড়ে না তোমার?”

দেখলাম চান্দের আলোতে ইলনের মুখ একপ্রকার আনন্দে কেমন যেনো চিকচিক করছে। হঠাৎ বলে উঠলো-

-” নুরু?”

তুই! সম্বোধনটায় বেশ ভালো লাগলো আমার। যাক ইলন তাহলে আমারে ভুলে নাই।

-“আমি মনে করছিলাম..” বলেই ঘরের দিকে চেয়ার আনতে যেতে চাইলে আমিও দ্রুত তুইতে নেমে আসলাম এবং বললাম-

-“কিচ্ছুর দরকার নাইরে ইলন। সমস্যা না থাকলে চল উন্মুক্ত ঐ মাঠে কিছুক্ষণ গিয়ে বসি।

চাঁদনী পশর রাত। ভরা পূর্ণীমার আলোতে দুধেল চাদরে ছেয়ে আছে চারপাশ। দূর কোথায়ও একটি নির্জন বন থেকে একাকী একটি শীল্লা পাখির ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম। শীল্লা পাখির কন্ঠে কেমন যেনো একটা সঙ্গীহারা কাতরতা ফুটে উঠছিলো।

বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে উন্মুক্ত মাঠের একটি পতিত জমির উঁচু আলে বসলাম আমি আর ইলন।

কতোদিন পর এক সাথে বসা! ৩৩ বছর! আহারে জীবন!

হঠাৎ খচখচ একটা শব্দ কানে ভেসে আসলো। প্রথম একটি, তারপর দুটি, তিনটি তারপর একঝাঁক শিয়াল বাচ্চা-কাচ্চা, ছাও-পোনাসহ আমাদের বসার ঠিক কাছাকাছি দূরের উঁচু একটি জমির আলে জড়ো হয়ে হুক্কাহুয়া রবে রাত্রির তৃতীয় প্রহরের চূড়ান্ত ঘন্টাধ্বনী বাজিয়ে দিয়ে গেলো।

রাতের বিভিন্ন প্রহরের বিভিন্ন সৌন্দর্য্য ফুটে উঠে। রাতের চার প্রহরে বিভিন্ন নিশাচর প্রাণীরা একসাথে জেগে উঠেনা। ভিন্ন ভিন্ন প্রহরে ভিন্ন ভিন্ন প্রাণী জেগে উঠে, খাবারের খোঁজ করে। রাতও বিভিন্ন নিশাচর প্রাণী, প্রকৃতির রহস্যময় খেলাও সৌন্দর্য্যকে কেন্দ্র করে প্রহর ভিত্তিক এক এক রুপ ধারন করে।

ঝিঁঝিঁ পোকাদের ডাকে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছিলো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য আমি ইলনকে বললাম-

-‘”বিড়ি-টিড়ি খাস নাকিরে ইলন?”

-“হু!” লাজুক ভঙ্গিতে জবাব দিলো ইলন।

-হু কিরে? বিড়ি ধরা।”

কোমড়ের কাছে লুঙ্গির প্যাচে গুজে রাখা বিড়ির বান বের করলো ইলন। সে কিছুটা লজ্জ্বা পাচ্ছিলো। আমি চিকিৎসক মানুষ। আমার সামনে বিড়ি খাওয়াটা তার কাছে বিরাট এক অপরাধ সমান বিষয় মনে হলো। বললাম-

-“আমারেও একটা দে।”

আমার কথা শুনে হঠাৎ আকাশ থেকে যেনো মাটিতে পড়লো ইলন। বললো-

-“তুই বিড়ি খাস নাকি? তুই না ডাক্তার!”

-“খাই মাঝেমধ্যে। ম্যাচটা দে।”

পাতার বিড়ি। এলাকায় এগুলো ইন্ডিয়ান বিড়ি হিসাবে পরিচিত। চান্দের আলোতে দেখলাম নিশ্চিন্ত মনে মহা আনন্দে বিড়ি টেনে চলেছিলো ইলন।

-“তর মনে আছে ইলন, লেংটা হয়ে ফুটবল খেলার জন্য হাবিবউল্লাহ স্যার কী মাইরটা না দিয়েছিলো স্কুলে!”

ইলন বললো, তার বেশ মনে আছেরে।

-“বেশি মারছিলো আমারে।কাঁচা জিংলার বাড়ি, হাত দাগ পইড়া গেছিলো!”

রাতের প্রহর বেড়ে চলছিলো। আমাদের শৈশবের কতো স্মৃতি যে সেদিন হারিয়ে যাওয়া মহাকালের অতল গহব্বর থেকে জলজ্যান্ত হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠেছিলো। আমরা সমস্ত দেয়াল ভেঙ্গেচুড়ে যেনো শৈশবের একাত্মা হয়ে গল্পে মেতে উঠলাম।

সেদিন আমাদের উপর ভরাপূর্ণীমার জোছনা সমানভাবেই দুধেল চাদরের মতো আবৃত করে ঘিরে রেখেছিলো। প্রকৃতির এই খেলাটা দারুণ! কারো প্রতিই প্রকৃতির আলাদা কোন দেয়াল নাই, একচোখা কোন রীতি নাই, বন্টনে কোন কার্পণ্যবোধ নাই, বিচারে কোন অবিচার নাই।

আরেকটা পাতার বিড়ি ধরালো ইলন। জানতে চাইলে বললো তার দুই ছেলে, দুই মেয়ে। তার বাবা মারা গেছে কয়েব বছর আগে। মা তার সাথেই থাকে। মেয়েটা সবচেয়ে বড়। কর্মঠ ছেলে দেখে বিয়ে দিয়েছে আজ প্রায় দুই বছর হলো।

কথার এক ফাঁকে ইলন কে আমি বললাম-

-“বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধনীকে জানস?”

আমার প্রশ্নে ইলন কিছুটা ইতস্তত হলো। অপরাগ কন্ঠে বললো, সে চিনে না। আরো বললো সংসারের ঘানি টানতে টানতেই, কখন তার দিন আসে, কখন তার রাত আসে, তারই হিসাব রাখা যার পক্ষে কঠিন, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী লোকটাকে চিনে তার কি লাভ।

দশ বছর আগে শহরের একগলিতে তাকে যে কর্মে ব্যস্ত দেখেছিলাম, তার ব্যবসা ঐটাই। বিকালে গ্রামের বাজারে বাজারে ঘুরে সবজি সংগ্রহ করা এবং ভোরে সেই সবজি নিয়ে শহরপানে ফেরি করে বিক্রির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া।

খুবই ন্যায্য কথা। তারপরেও আমি নিজ থেকেই তাকে বললাম-

-“পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী লোকের নাম হলো ইলন মাস্ক। সে আমেরিকায় থাকে।”

ইলনের এই বিষয়ে কোন বিকার দেখলাম না।

আকাশে ভরা পূর্ণীমার সাথে তারকারাজির মেলা বসেছিলো। রাত বেড়ে চলছিলো। আমাদের আলাপচারিতায় নির্জন পরিবেশ যেনো অনন্য হয়ে উঠলো।

আলাপচারিতায় সংসারের গল্প করতে করতে এক সময় দেখলাম ইলনের মন একটু খারাপ হয়ে গেলো। আমি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে বিদায় নেয়ার জন্য বললাম-

-“পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী লোকের যে আকাশ,বাতাস, চাঁদ, সুরুজ, আমার আর তরও কিন্তু সেই একই আকাশ, বাতাস, চাঁদ, সুরুজ।”

আমার কথা শুনে ইলন খানিকটা হাসলো। বললো-

-“তুই যে এতোদিন পর আমারে খুঁজে বের করলি, এতেই আমি আইজ মহাখুশি। বাদ দে এসব কথা।”

-” দশ বছর আগে একবার তর সাথে দেখা হয়েছিলো আমার, আমি সবজি কিনেছিলাম তর কাছ থেকে, মনে আছে?”

ইলন বললো মনে আছে। কিন্তু পরিচয় দেয়নি

-“যদি আমি না চিনি?”

-“যদি আমি না চিনি?”

কিংবা চিনেও যদি না চেনার ভান করি। বিষয়টা আমাকে কিছুটা হলেও বিকারগ্রস্থ করে তুললো। সত্যিই তো!

রাতের তৃতীয় প্রহর প্রায় শেষ। আমাকে গন্তব্যে পৌঁছাতে পাঁচ-সাত গ্রাম পাড়ি দিতে হবে। কোলাকুলির পর ইলন আমাকে এগিয়ে দেয়ার প্রস্তাব করলে, আমি না করে দিয়ে মেঠোপথ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম।

ধবল জোছনার সাথে আমার ছায়া আমার সাথে হেঁটে চলছিলো। হৃদয় মস্তিষ্ক জুড়ে একটি সত্যি আমাকে পথে পথে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিলো-“যদি আমি না চিনি?”

 

 

হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো-

-“এই পৃথিবীর পুরো মানব সভ্যতাই দেয়ালের পর দেয়াল দিয়ে আলাদা হয়ে আছে। শিক্ষা-শিক্ষায় দেয়াল, সনদ-সনদে দেয়াল, অর্থ-বিত্তের দেয়াল, পেশায়-পেশায় দেয়াল, গোত্রে-গোত্রে দেয়াল, বিশ্বাস-বিশ্বাসে দেয়াল, ধর্ম-ধর্মে দেয়াল, দেশে-দেশে দেয়াল, স্থান-কাল-পাত্রভেদে দেয়াল, জাতে-জাতে দেয়াল, পাতে-পাতে দেয়াল, কালো দেয়াল, সাদা দেয়াল? কতো কতো দেয়াল? চারিদিকে শুধু দেয়াল আর দেয়াল- মানুষকে আলাদা করার কতো সব দেয়াল!

এই দেয়াল ভাঙবে কে?