ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ২০২৬
গণরায়ে নতুন ভোরের অপেক্ষায় বাংলাদেশ; বিএনপির নিরঙ্কুশ জয় ও তারেক রহমানের অভিষেক
- আপডেট সময়ঃ ১০:১৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ২ বার পড়া হয়েছে।
দীর্ঘ ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসন এবং এক অভাবনীয় রাজনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দিনভর ভোটগ্রহণ শেষে রাতভর গণনায় যে ফলাফল উঠে এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল জনসমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে। ২৬০টি আসনের বেসরকারি ফলাফলে ১৯৭টিতে জয়লাভ করে বিএনপি ও সমমনা জোট কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতাই নয়, বরং শাসনের নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট লাভ করেছে।
ফলাফল বিশ্লেষণ ও আসন ভাগাভাগিঃ
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, ২৯৯টি আসনের মধ্যে অধিকাংশেরই ফলাফল ঘোষিত হয়েছে। এর মধ্যে:
* বিএনপি জোট: ১৯৭টি আসন (প্রয়োজনীয় ১৫১ আসনের অনেক বেশি)।
* বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (১১ দলীয় জোট): ৫৮টি আসন। এই জোটটি নির্বাচনে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
* জাতীয় নাগরিক দল (NCP) ও স্বতন্ত্র: ৪টি আসন। এর মধ্যে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী নাগরিক দল কিছু আসনে চমক দেখিয়েছে।
শেরপুর-৩ আসনে প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে নির্বাচন স্থগিত রয়েছে। এছাড়া কয়েকটি কেন্দ্রে পুনর্গণনার আবেদনের কারণে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশে সামান্য সময় লাগতে পারে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ৩৬ বছর পর পুরুষ নেতৃত্বঃ
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় আলোচিত বিষয় হলো নেতৃত্বের লিঙ্গীয় পরিবর্তন। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার পতন পরবর্তী প্রতিটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন নারী নেত্রীরা (বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা)। সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে কাজী জাফর আহমেদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন, যা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা। তারেক রহমান নিজে বগুড়া-৬ এবং ঢাকা-১৭ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন।
নির্বাচনের বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহঃ
এবারের নির্বাচনকে বিশ্লেষকরা ‘জেন-জি ইনস্পায়ার্ড ইলেকশন’ হিসেবে অভিহিত করছেন। এর কিছু বিশেষ দিক হলো:
১. পোস্টাল ব্যালট: ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১২৪টি দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে ভোট দিয়েছেন। প্রায় ১২ লাখ প্রবাসীর ভোট এবারের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
২. দ্বৈত ভোট: ভোটাররা দুটি ব্যালটে ভোট দিয়েছেন—একটি সংসদীয় আসনের প্রার্থীর জন্য (সাদা ব্যালট) এবং অন্যটি ‘জাতীয় সনদ’ বা সংস্কার প্রস্তাবের ওপর গণভোটের জন্য (গোলাপী ব্যালট)।
৩. ভোটের হার: তীব্র শীত উপেক্ষা করে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। দুপুর ১২টা নাগাদই ভোটের হার প্রায় ৩২.৮৮% ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
বিজয় উদযাপন ও বিএনপির পরবর্তী পদক্ষেপঃ
বিপুল এই বিজয়ের পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক বিশেষ বার্তায় নেতাকর্মীদের সংযত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছেঃ
* আজ জুমার নামাজের পর দেশব্যাপী ‘শুকরিয়া দিবস’ পালন করা হবে।
* গত দেড় দশকের রাজনৈতিক আন্দোলন ও জুলাই বিপ্লবে শহীদদের স্মরণে বিশেষ মোনাজাত করা হবে।
* সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিটি এলাকায় ‘সম্প্রীতি কমিটি’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশাঃ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে তার প্রধান কাজ। বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির যে স্বপ্ন দেখিয়েছে, তা বাস্তবায়নই এখন বড় পরীক্ষা।
১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের এই বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ১২৪টি দেশ থেকে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিরা এই পরিবর্তনের অংশীদার হতে চেয়েছেন। স্থগিত হওয়া শেরপুর-৩ আসনসহ বাকি আসনগুলোর ফলাফল আসার পর সংসদের পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়া যাবে। তবে সংখ্যার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াবে সুশাসন।
জনগণ কেবল ভোট দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেনি, তারা একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি, ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার দেখতে চায়। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ৫৮টি আসনে জয় এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতি সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ বা মিত্রতার ভারসাম্য তৈরি করবে কি না, সেটিও দেখার বিষয়।
পরিশেষে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে নতুন সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে, তাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তনের যে রায় দিয়েছে, সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করাই হবে নতুন প্রশাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
#সম্পাদকীয়










