বাঁওড় এলাকায় মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প; ৩ কোটি টাকার মাছ ছাড়তে খরচ ৪৫ কোটি
- আপডেট সময়ঃ ০৯:২৪:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
- / ২৬ বার পড়া হয়েছে।
হকবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট;
সুনামগঞ্জ ।। ২১ অক্টোবর ২০২৬
মাছের পোনা কিনতে খরচ হবে ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা (প্রায় ৩ কোটি টাকা)। অথচ সেই পোনা বাঁওড়ে ফেলা ও অন্যান্য পরিচালন খাতেই ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা! অর্থাৎ, ১ টাকার পোনা বাঁওড়ে ছাড়তে আনুষঙ্গিক অন্যান্য খাতে খরচ প্রস্তাব করা হয়েছে ১৫ টাকা। মৎস্য অধিদপ্তরের ‘নির্বাচিত বাঁওড় এলাকায় সমাজভিত্তিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক একটি উন্নয়ন প্রকল্পে এমন অস্বাভাবিক ব্যয় প্রস্তাবের চিত্র উঠে এসেছে।
যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ২৯টি বাঁওড়ে (নদীর পরিত্যক্ত বাঁক থেকে সৃষ্ট জলাশয়) মাছের উৎপাদন মাত্র ১০ শতাংশ বাড়াতে মোট ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের ব্যয় কাঠামোর যৌক্তিকতা নিয়ে ইতোমধ্যে গভীর অসন্তোষ ও আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
মোট ব্যয়ের ৯৪ শতাংশই অন্যান্য খাতে!
প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাবনা (ডিপিপি) বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ের মধ্যে মূল উপাদান অর্থাৎ পোনা কেনার জন্য বরাদ্দ মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশ (২ কোটি ৯০ লাখ টাকা)। বাকি ৯৩ দশমিক ৯০ শতাংশ বা ৪৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকাই ব্যয় হবে আনুষঙ্গিক অন্যান্য খাতে।
প্রকল্পের আওতায় ২৯টি বাঁওড়ে রুই ও দেশি ছোট প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বর্তমান উৎপাদন পরিস্থিতি এবং লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তি নিয়ে অস্পষ্টতা দেখা গেছে। ২৯টি বাঁওড়ে বর্তমানে বছরে ঠিক কত পরিমাণ মাছ উৎপাদিত হয়, ১০ শতাংশ উৎপাদন বাড়লে অতিরিক্ত কত মাছ পাওয়া যাবে এবং কত সংখ্যক পোনা কী দরে কেনা হবে—তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়নি। এছাড়া অবমুক্ত করা পোনার বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠা কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, সে বিষয়েও তথ্যের ঘাটতি রয়েছে।
সরঞ্জাম ও পরিচালন ব্যয়ে অস্বাভাবিকতা;
প্রকল্পটির বিভিন্ন খাতের পরিচালন ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন: কম্পিউটার কেনায় আকাশচুম্বী দর: ৪টি কম্পিউটার ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি কম্পিউটারের গড় দাম ধরা হয়েছে ২ লাখ টাকা। কনফিগারেশন ও যন্ত্রাংশের বিস্তারিত না থাকায় এ দর অতিমূল্যায়িত কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যান্য অফিস সরঞ্জাম ও আয়োজন: এসি ও ফটোকপি মেশিন কেনা, কার্যালয় ভাড়া এবং সভা-সেমিনার আয়োজনের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে, যা মূল মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত তা স্পষ্ট নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “বাঁওড়ে মাছের উৎপাদন বাড়ানো একটি মহৎ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। কিন্তু এর জন্য এসি, কম্পিউটার ও সেমিনারের নামে যে ধরনের অস্বাভাবিক ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে, তাতে অনিয়মের স্পষ্ট সুযোগ সৃষ্টি হয়। পোনা কেনার বাইরে এত বিপুল খরচে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কতটুকু অবদান রাখবে, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
জনবল কাঠামো ও এডিপি বরাদ্দ স্থিতি;
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৬টি পদে জনবল নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে—যার মধ্যে ৩টি প্রেষণে, ১টি অতিরিক্ত দায়িত্বে এবং ২টি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে। ৫ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পে পদগুলোর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও বেতন-ভাতা সংক্রান্ত ব্যয়ের হিসাব স্পষ্ট করার নির্দেশ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
বর্তমানে প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দবিহীন অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ১ অক্টোবরের চিঠি অনুযায়ী প্রকল্প প্রস্তাবটি মূল্যায়ন কমিটির পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য;
প্রকল্পের ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও অসঙ্গতি নিয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. খালেদ কনক জানান, তিনি এখনো ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) সম্পূর্ণ দেখেননি, তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।
তিনি প্রকল্পের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সাহেদ আলীর সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তবে প্রস্তাবিত ডিপিপি প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা সাহেদ আলীর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
শিগগিরই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এসব ব্যয়ের অস্পষ্টতা ও আনুষঙ্গিক খরচের যৌক্তিকতা নিয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে বলে জানা গেছে।




















