০৪:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬
‎ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি লাকেম্বা মসজিদঃ

বিক্ষোভের মুখে পেছনের দরজা দিয়ে পালালেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী

হক বার্তা ডেস্ক রিপোর্টঃ
  • আপডেট সময়ঃ ১২:৪৭:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬
  • / ২৬ বার পড়া হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত লাকেম্বা মসজিদ। যা দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

রমজানের শেষ লগ্নে এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে সেখানে জীবনের অন্যতম তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। 

শান্ত পরিবেশ মুহূর্তেই রাজনৈতিক প্রতিবাদে রূপ নেয়, যেখানে খোদ প্রধানমন্ত্রীকে ‘গণহত্যার সমর্থক’ এবং অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ভাষায় গালিগালাজ করে মসজিদ ছাড়তে বাধ্য করেন ক্ষুব্ধ মুসল্লিরা।

‎লন্ডনভিত্তিক অনলাইন টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক যখন মসজিদে প্রবেশ করেন, তখন সেখানে ধর্মীয় গাম্ভীর্য বিরাজ করছিল। সাধারণত এসব অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতারা বক্তৃতা দেন, কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন।

সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের তথ্যমতে, মসজিদ কর্তৃপক্ষ আগেই প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছিল তিনি যেন কোনো বক্তব্য না দিয়ে শুধু উপস্থিত থেকে মানুষের কথা শোনেন। কিন্তু অনুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই মুসল্লিদের একটি বড় অংশ আলবানিজকে লক্ষ্য করে চিৎকার শুরু করেন। তারা তাকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন।

‎ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, জনরোষের মুখে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিছুক্ষণ পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিলেন। বিক্ষোভকারীরা চিৎকার করে বলতে থাকেন, “ও এখানে কেন? ওকে এখান থেকে বের করে দাও!”

পরিস্থিতি সামাল দিতে মসজিদের সেক্রেটারি গামেল খেইর সবাইকে শান্ত থাকার এবং ইবাদতের জায়গার সম্মান রক্ষার অনুরোধ জানান। কিন্তু তার সেই কণ্ঠস্বর প্রতিবাদী স্লোগানের নিচে চাপা পড়ে যায়।

এক পর্যায়ে মসজিদের ভেতরেই মুসল্লিদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়; পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, একজনের মুখ চেপে ধরে অন্যকে চিৎকার থামাতে দেখা যায়।

‎নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত রক্ষীরা দ্রুত তাকে সরিয়ে নিয়ে যান। আলবানিজকে প্রথমে মসজিদের প্রশাসনিক অফিসে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরিস্থিতি শান্ত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাকে মসজিদের পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়।

যখন প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর এলাকা ত্যাগ করছিল, তখন চারপাশ থেকে ‘লজ্জা! লজ্জা!’ স্লোগান শোনা যায়। কেউ কেউ তার পদবির সঙ্গে আপত্তিকর আরবি শব্দ জুড়ে দিয়ে তাকে অপমান করতে থাকেন।

‎এই নজিরবিহীন জনরোষের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রাজনৈতিক অসন্তোষ।

লাকেম্বা এলাকাটি ঐতিহ্যগতভাবে আলবানিজের লেবার পার্টির শক্ত ঘাঁটি হলেও গাজা ও লেবানন যুদ্ধ নিয়ে সরকারের অবস্থান স্থানীয়দের ক্ষুব্ধ করেছে।

২৯ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারী সেকলাউই বলেন, “প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েলের রক্তমাখা হাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে করমর্দন করেন, আবার এখানে এসে ভান করেন যেন কিছুই হয়নি—এটা মেনে নেওয়া যায় না।”

এছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পাস হওয়া ‘কম্ব্যাটিং এন্টি-সেমিটিজম অ্যান্ড হেট এক্সট্রিমিজম’ আইন এই আগুনি ঘৃতাহুতি দিয়েছে।

বিশেষ করে দুই সপ্তাহ আগে এই আইনের অধীনে ইসলামপন্থী সংগঠন ‘হিজবুত তাহরির’কে নিষিদ্ধ করা এবং তাদের সদস্যদের জন্য ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা মুসলিম সম্প্রদায়কে বিক্ষুব্ধ করেছে। তাদের মতে, সরকার ইসলামবিদ্বেষ ঠেকাতে ব্যর্থ হলেও মুসলিম কণ্ঠস্বর দমনে অত্যন্ত তৎপর।

‎এমন অপমানজনক পরিস্থিতির শিকার হয়েও প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) কিছু হাস্যোজ্জ্বল ছবি পোস্ট করেন।

সেখানে তিনি দাবি করেন যে, সামগ্রিকভাবে তার অভ্যর্থনা ছিল ইতিবাচক। তিনি ঘটনাটিকে খাটো করে দেখে বলেন, “আমাকে কেউ তাড়িয়ে দেয়নি। ভেতরে দু-একজন আপত্তি জানিয়েছিল, যা উপস্থিত মানুষরাই সামলে নিয়েছেন।” 

তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিডিও ফুটেজ বলছে ভিন্ন কথা- যেখানে দেখা গেছে দেশের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তাকে চরম অপদস্থ হয়ে পেছনের পথ দিয়ে বিদায় নিতে হয়েছে।

‎তথ্যসহায়তাঃমানবজমিন

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

‎ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি লাকেম্বা মসজিদঃ

বিক্ষোভের মুখে পেছনের দরজা দিয়ে পালালেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী

আপডেট সময়ঃ ১২:৪৭:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত লাকেম্বা মসজিদ। যা দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

রমজানের শেষ লগ্নে এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে সেখানে জীবনের অন্যতম তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। 

শান্ত পরিবেশ মুহূর্তেই রাজনৈতিক প্রতিবাদে রূপ নেয়, যেখানে খোদ প্রধানমন্ত্রীকে ‘গণহত্যার সমর্থক’ এবং অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ভাষায় গালিগালাজ করে মসজিদ ছাড়তে বাধ্য করেন ক্ষুব্ধ মুসল্লিরা।

‎লন্ডনভিত্তিক অনলাইন টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক যখন মসজিদে প্রবেশ করেন, তখন সেখানে ধর্মীয় গাম্ভীর্য বিরাজ করছিল। সাধারণত এসব অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতারা বক্তৃতা দেন, কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন।

সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের তথ্যমতে, মসজিদ কর্তৃপক্ষ আগেই প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছিল তিনি যেন কোনো বক্তব্য না দিয়ে শুধু উপস্থিত থেকে মানুষের কথা শোনেন। কিন্তু অনুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই মুসল্লিদের একটি বড় অংশ আলবানিজকে লক্ষ্য করে চিৎকার শুরু করেন। তারা তাকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন।

‎ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, জনরোষের মুখে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিছুক্ষণ পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিলেন। বিক্ষোভকারীরা চিৎকার করে বলতে থাকেন, “ও এখানে কেন? ওকে এখান থেকে বের করে দাও!”

পরিস্থিতি সামাল দিতে মসজিদের সেক্রেটারি গামেল খেইর সবাইকে শান্ত থাকার এবং ইবাদতের জায়গার সম্মান রক্ষার অনুরোধ জানান। কিন্তু তার সেই কণ্ঠস্বর প্রতিবাদী স্লোগানের নিচে চাপা পড়ে যায়।

এক পর্যায়ে মসজিদের ভেতরেই মুসল্লিদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়; পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, একজনের মুখ চেপে ধরে অন্যকে চিৎকার থামাতে দেখা যায়।

‎নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত রক্ষীরা দ্রুত তাকে সরিয়ে নিয়ে যান। আলবানিজকে প্রথমে মসজিদের প্রশাসনিক অফিসে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরিস্থিতি শান্ত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাকে মসজিদের পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়।

যখন প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর এলাকা ত্যাগ করছিল, তখন চারপাশ থেকে ‘লজ্জা! লজ্জা!’ স্লোগান শোনা যায়। কেউ কেউ তার পদবির সঙ্গে আপত্তিকর আরবি শব্দ জুড়ে দিয়ে তাকে অপমান করতে থাকেন।

‎এই নজিরবিহীন জনরোষের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রাজনৈতিক অসন্তোষ।

লাকেম্বা এলাকাটি ঐতিহ্যগতভাবে আলবানিজের লেবার পার্টির শক্ত ঘাঁটি হলেও গাজা ও লেবানন যুদ্ধ নিয়ে সরকারের অবস্থান স্থানীয়দের ক্ষুব্ধ করেছে।

২৯ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারী সেকলাউই বলেন, “প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েলের রক্তমাখা হাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে করমর্দন করেন, আবার এখানে এসে ভান করেন যেন কিছুই হয়নি—এটা মেনে নেওয়া যায় না।”

এছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পাস হওয়া ‘কম্ব্যাটিং এন্টি-সেমিটিজম অ্যান্ড হেট এক্সট্রিমিজম’ আইন এই আগুনি ঘৃতাহুতি দিয়েছে।

বিশেষ করে দুই সপ্তাহ আগে এই আইনের অধীনে ইসলামপন্থী সংগঠন ‘হিজবুত তাহরির’কে নিষিদ্ধ করা এবং তাদের সদস্যদের জন্য ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা মুসলিম সম্প্রদায়কে বিক্ষুব্ধ করেছে। তাদের মতে, সরকার ইসলামবিদ্বেষ ঠেকাতে ব্যর্থ হলেও মুসলিম কণ্ঠস্বর দমনে অত্যন্ত তৎপর।

‎এমন অপমানজনক পরিস্থিতির শিকার হয়েও প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) কিছু হাস্যোজ্জ্বল ছবি পোস্ট করেন।

সেখানে তিনি দাবি করেন যে, সামগ্রিকভাবে তার অভ্যর্থনা ছিল ইতিবাচক। তিনি ঘটনাটিকে খাটো করে দেখে বলেন, “আমাকে কেউ তাড়িয়ে দেয়নি। ভেতরে দু-একজন আপত্তি জানিয়েছিল, যা উপস্থিত মানুষরাই সামলে নিয়েছেন।” 

তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিডিও ফুটেজ বলছে ভিন্ন কথা- যেখানে দেখা গেছে দেশের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তাকে চরম অপদস্থ হয়ে পেছনের পথ দিয়ে বিদায় নিতে হয়েছে।

‎তথ্যসহায়তাঃমানবজমিন