ভেনেজুয়েলার নতুন অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের সামনে, যে তিন শর্ত দিল যুক্তরাষ্ট্র
- আপডেট সময়ঃ ১২:৩০:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৩৯ বার পড়া হয়েছে।
নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যেই দেশটির নতুন অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের সামনে তিন শর্ত তুলে ধরেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এসব শর্ত না মানলে সামরিক চাপ বাড়ানোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এক মার্কিন কর্মকর্তা ও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনার সঙ্গে পরিচিত আরেকজনের বরাতে জানা গেছে, ভেনেজুলেয়ার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের কাছে অন্তত তিনটি পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
শর্তগুলো হলো- মাদক পাচার কঠোরভাবে দমন করা; ইরান, কিউবা ও ওয়াশিংটনবিরোধী অন্যান্য দেশ বা নেটওয়ার্কের অপারেটিভদের ভেনেজুয়েলা থেকে বহিষ্কার করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ দেশগুলোর কাছে তেল বিক্রি বন্ধ করা।
পলিটিকোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে, বর্তমানে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব দেওয়া ডেলসি রদ্রিগেজ একপর্যায়ে অবাধ নির্বাচন আয়োজন করবেন এবং ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াবেন। তবে এসব দাবির নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো চূড়ান্ত নয়। মার্কিন কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, শিগগিরই কোনো নির্বাচন হচ্ছে না।
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটির শাসক নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার দুই দিন পরও ওয়াশিংটনের পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কিছুই অস্পষ্ট। হোয়াইট হাউসের দাবি, এটি কোনো সরকার উৎখাতের অভিযান বা যুদ্ধ নয়; বরং একজন মাদকসম্রাটের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পদক্ষেপ। এ ব্যাখ্যার মাধ্যমেই এখন পর্যন্ত নেওয়া সীমিত পদক্ষেপগুলোকে যুক্তি দিচ্ছে প্রশাসন।
তবে ট্রাম্পের নাটকীয় সিদ্ধান্ত ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলার প্রবণতা ভেনেজুয়েলায় এসে বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে। অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত ৩ কোটি মানুষের এই দেশে ভুল পদক্ষেপ সহিংসতা ও বড় ধরনের অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে।
সম্ভাব্য যে কোনো মার্কিন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ডেলসি রদ্রিগেজ। তিনি মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শে দৃঢ় হলেও, মার্কিন প্রশাসন মনে করছে-তিনি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কথামতোই চলবেন। নতুবা বড় ধরনের সামরিক অভিযানের মুখে পড়তে পারেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প।
গত রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা এখন পর্যন্ত খুব ভদ্র আচরণ করছে। তবে আমাদের মতো শক্তিশালী বাহিনী থাকাটা কাজে দেয়। তারা যদি ঠিকমতো না চলে, আমরা দ্বিতীয়বার হামলা করব।’
এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। পলিটিকোকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর আগের বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে জানায়, মাদুরোর তুলনায় রদ্রিগেজের কাছ থেকে বেশি সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। জেনেভায় ভেনেজুয়েলার জাতিসংঘ মিশনও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানান, প্রশাসনের বর্তমান লক্ষ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে দেশটির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। তবে রদ্রিগেজের কাছে দেওয়া দাবিগুলোর বিষয়ে তিনি বিস্তারিত বলতে রাজি হননি।
গত রোববার এবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ভেনেজুয়েলা আর দেখতে চায় না, যা ইরান ও হিজবুল্লাহসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিপক্ষ শক্তির মিলনস্থল, মাদক চক্রের স্বর্গ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাঠানোর কেন্দ্র।
তবে রদ্রিগেজকে দেওয়া নির্দেশনাগুলো রুবিওর প্রকাশ্য বক্তব্যের চেয়েও অনেক বেশি নির্দিষ্ট, কঠোর ও গভীর বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি বলেন, ট্রাম্প টিম মনে করে রদ্রিগেজ এখন ‘ছোট রশিতে বাঁধা।’ প্রয়োজনে তাকে নিজেদের ইচ্ছেমতো চালানো যাবে, তারপর তাকে সরিয়ে সামনে এগোনো হবে।
অভ্যন্তরীণ সংবেদনশীল আলোচনা হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব কথা বলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
কয়েক দিনের মধ্যেই অবস্থান বদলেছেন রদ্রিগেজ। শুরুতে মাদুরোকে আটক করার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করলেও, রোববার রাতে তিনি বলেন ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সহযোগিতার এজেন্ডা’ নিয়ে কাজ করতে তিনি প্রস্তুত।
রুবিও টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন, ট্রাম্পের ‘ভেনেজুয়েলা চালানো’র বক্তব্য মূলত রদ্রিগেজের ওপর চাপ তৈরির কৌশল। তিনি নির্বাচন প্রসঙ্গও তুলেছেন, তবে শিগগিরই তা হবে, এমন প্রত্যাশা কমাতে চেয়েছেন।
ট্রাম্পের উপদেষ্টা রিচার্ড গ্রেনেল, রদ্রিগেজকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতায় রাখার পক্ষেও ছিলেন বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। তবে বর্তমানে ভেনেজুয়েলা নীতিনির্ধারণে গ্রেনেলের কোনো ভূমিকা নেই বলেও জানান তিনি।
একই সঙ্গে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ভেনেজুয়েলায় নির্বাচন নিয়ে কথা বলার সময় এখনো আসেনি, এমনটাই মনে করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
প্রথমে ট্রাম্প প্রশাসনে ভেনেজুয়েলা বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ছিলেন এলিয়ট অ্যাব্রামস। তিনি বলেন, ‘রদ্রিগেজ ও অন্যদের ওপর আমাদের বিপুল প্রভাব রয়েছে। আমরা প্রমাণ করেছি, চাইলে কারাকাসের মাঝখান থেকেও কাউকে ধরে আনতে পারি।’
অ্যাব্রামসের মতে, শুধু তার অর্থসম্পদ নিয়ে আলোচনার ইঙ্গিতই রদ্রিগেজের জন্য বড় চাপ হয়ে উঠতে পারে। এখন পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা বড় পরিসরে মানবিক সহায়তা পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র।
মাদুরোকে আটক করার আগে বিভিন্ন সংস্থায় নিষেধাজ্ঞা শিথিলসহ ‘পরবর্তী করণীয়’ নিয়ে ভাবনা থাকলেও, কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ভেনেজুয়েলায় আটক মার্কিন নাগরিকদের মুক্তি দিতে। তবে দেশটির রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির বিষয়ে স্পষ্ট কোনো দাবি না থাকায় উদ্বিগ্ন অনেক রিপাবলিকান পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক।
বর্তমানে মাদুরো-পরবর্তী সময়ের কাজ অনেকটাই দূর থেকে পরিচালনার কথা ভাবছে ট্রাম্প প্রশাসন। যদিও ট্রাম্প জানিয়েছেন, কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস পুনরায় চালুর বিষয়টি তিনি বিবেচনা করছেন।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-মাদুরোর ঘনিষ্ঠদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। এদের কেউ কেউ সশস্ত্রও। রদ্রিগেজ ছাড়াও এতে রয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ। এক সূত্রের ভাষ্যমতে ‘এটা বিষধর সাপের গর্ত।’
বিশ্লেষকদের মতে, রদ্রিগেজের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ অনেক ভেনেজুয়েলান মনে করেন- মাদুরোকে ধরিয়ে দেওয়ার পেছনে তার ভূমিকা থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপের মুখে রদ্রিগেজের সামনে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। তিনি যদি যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে চলেন, তবে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে। অন্যদিকে, শর্ত না মানলে সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বাড়বে, যা দেশের স্থিতিশীলতাকে আরও বিপন্ন করবে।
ভেনেজুয়েলার জনগণও এই পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন। তারা একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে। অনেকেই আশা করছেন, রদ্রিগেজ একটি সমঝোতা করতে সক্ষম হবেন, যা দেশের জন্য শান্তি এবং উন্নয়নের পথ সুগম করবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রদ্রিগেজের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দেশের ভেতরে এবং বাইরে থেকে আসা চাপের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। তার নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলা যদি একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যেতে পারে, তবে তা দেশের ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক হবে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। তারা আশা করছে, দেশটি একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে এগিয়ে যাবে এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করবে।
তথ্যসহায়তাঃ











