ক্যাম্পাসে লাশের মিছিলঃ
মাত্র ২৪ ঘণ্টায় নিভে গেল ৫টি উজ্জ্বল নক্ষত্র
- আপডেট সময়ঃ ০৫:০৪:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬
- / ১১ বার পড়া হয়েছে।
দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে গত ২৪ ঘণ্টা যেন হয়ে উঠেছিল এক বিষাদময় মৃত্যুপুরী। একের পর এক দুঃসংবাদে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজসহ প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাত থেকে শুরু করে শুক্রবার (৩ এপ্রিল) বিকেলের মধ্যে ঝরে গেছে পাঁচটি তাজা প্রাণ।
মেধার যে আলোয় পরিবার ও দেশ আলোকিত হওয়ার কথা ছিল, তা নিভে গেল এক গভীর আঁধারে। নিহতদের মধ্যে তিনজন বেছে নিয়েছেন আত্মহননের পথ, আর বাকি দুজন জীবনের যুদ্ধে হেরে গেছেন গুরুতর অসুস্থতার কাছে।
বৃহস্পতিবার রাতের অন্ধকার নামার সাথে সাথেই প্রথম দুঃসংবাদটি আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে। বিভাগের শেষ বর্ষের মেধাবী শিক্ষার্থী সীমান্ত রাজধানীর হাজারীবাগের বাসায় অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়কভাবে আত্মহনন করেন।
পুলিশি তদন্ত ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত ঘরে থাকা ‘বিষাক্ত দ্রব্য’ (ছারপোকা মারার ওষুধ) পান করেছিলেন। দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। কী এমন বিষাদ তাকে গ্রাস করেছিল, তা এখনো অস্পষ্ট।
একই রাতে উত্তরার একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সাবিত মাহমুদ শাওনের মরদেহ। শাওনের মৃত্যুটি সহপাঠীদের জন্য ছিল এক নিরব কষ্টের ধাক্কা। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা জানিয়েছেন, শাওন দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মানসিক বিষণ্নতায় ভুগছিলেন।
তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দেয়ালে শেষ দিকে ঝুলে ছিল অসংখ্য হতাশাগ্রস্ত পোস্ট, যা হয়তো কারো নজর কাড়তে ব্যর্থ হয়েছিল। জীবনের কঠিন লড়াইয়ে একাকী হয়ে যাওয়া এই তরুণ শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মাঝেই মুক্তি খুঁজেছেন।
সবচেয়ে বিতর্কিত এবং হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজে। সেখানে ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশিনের মরদেহ উদ্ধারের পর বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। সহপাঠীদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ—এনাটমি বিভাগের এক শিক্ষকের ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়েছিলেন নওশিন।
শিক্ষার্থীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রথম বর্ষ থেকেই ওই শিক্ষক নওশিনকে ফেল করানোর হুমকি দিয়ে আসছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় টানা পাঁচবার একই বিষয়ে তাকে অকৃতকার্য করানো হয়।
দীর্ঘদিনের এই পরিকল্পিত একাডেমিক চাপ আর মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে নওশিন একবারে ১০৯টি ঘুমের বড়ি সেবন করেন। একজন হবু চিকিৎসকের এমন করুণ প্রয়াণে চিকিৎসা অঙ্গনে বইছে নিন্দার ঝড়।
আত্মহত্যার এই মিছিলের মাঝেও প্রকৃতির নিষ্ঠুর নিয়মে প্রাণ হারিয়েছেন আরও দুই শিক্ষার্থী। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ নাফিজ শুক্রবার সকালে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নাফিজ দীর্ঘ সময় ধরে ব্রেইন ও স্নায়ুরোগের সাথে যুদ্ধ করছিলেন। ঢাকার নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসার পর তাকে বাড়ি নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু জীবনের অন্তিম দৌড়ে তিনি আর ফিরতে পারেননি।
অন্যদিকে, রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের মাঝে নেমে এসেছে কান্নার রোল। কলেজের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া সাবরী মাহি মারা গেছেন ডায়রিয়াজনিত শারীরিক জটিলতায়।
সহপাঠীদের বর্ণনায় অত্যন্ত শান্ত ও মেধাবী হিসেবে পরিচিত মাহির এই অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তার শিক্ষকরাও। একজন ভবিষ্যৎ চিকিৎসকের স্বপ্ন এভাবে হাসপাতালের বেডেই শেষ হয়ে যাবে, তা ছিল কল্পনার বাইরে।
মাত্র এক দিনে পাঁচটি মৃত্যু কেবল সংখ্যা নয়, বরং পাঁচটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা এবং একাডেমিক চাপের যে ভয়াবহ চিত্র অর্পিতা নওশিনের ঘটনায় উঠে এসেছে, তা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার এক অন্ধকার দিককে উন্মোচিত করেছে। কেন বারবার আমাদের মেধাবীরা জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে পড়ছে?
ক্যাম্পাসগুলোতে কি মানসিক স্বাস্থ্যের চেয়ে পরীক্ষার গ্রেড বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে? এই শোকের দিনে আজ এই প্রশ্নগুলোই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।











