শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট বন্যায়, পানির নিচে শ্রীলঙ্কা, মৃত প্রায় ২০০
- আপডেট সময়ঃ ০৭:০০:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১০৪ বার পড়া হয়েছে।
এক দশকে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপ রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট বন্যায় রাজধানী কলম্বোসহ দেশটির বহু অঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে।
ভয়াবহ এই বন্যায় মৃতের সংখ্যা ২০০ এর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
ধারণা করা হচ্ছে এই সংখ্যা আরও দীর্ঘ হবে। কারণ এখনো আরও দুই শতাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে দেশটির সরকার। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে।
আল জাজিরার এক খবরে বলা হয়েছে, শ্রীলঙ্কায় এবারের বন্যায় এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ১৯৩ জন। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র (ডিএমসি) জানিয়েছে, রাজধানী কলম্বোর বেশ কিছু অংশে পানি বেড়েই চলেছে। এখনো নিখোঁজ আছেন ২২০ জন।
রোববার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ডেইলি মিরর জানায়, নিখোঁজদের মধ্যে নৌবাহিনীর পাঁচ সদস্যও রয়েছেন। ডিএমসি জানিয়েছে, চরম আবহাওয়ার কারণে দেশ জুড়ে প্রায় ১৫ হাজার বাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ রাষ্ট্রীয় সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন।
আল জাজিরার প্রতিনিধি মিনেল ফার্নান্ডো জানান, ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে শ্রীলঙ্কা। তিনি বলেন, কিছু মহল্লা পুরোপুরিই কাদা-পানিতে চাপা পড়েছে। আর প্রতিটি ঘটনা নতুন হতাশা নিয়ে আসছে। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বেশ কয়েকটি এলাকা এখনো হালনাগাদ তথ্য দিতে পারেনি। অবিরাম বৃষ্টিতে নতুন করে রোপণ করা ধানক্ষেতও ডুবে গেছে বলে জানান তিনি।

ডিএমসি জানায়, কলম্বোর উত্তরাংশেও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কারণ কেলানি নদীর পানি অব্যাহতভাবে বাড়ছে।
এক কর্মকর্তা বলেন, ঘূর্ণিঝড় সরে গেলেও উজানে ভারী বর্ষণে নদীর তীরবর্তী নিচু অঞ্চলগুলো প্লাবিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট অনুঢ়া কুমারা দিশানায়েকে শনিবার জরুরি অবস্থা জারি করে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানান। সাড়া দিয়ে প্রথমেই ভারত ত্রাণসামগ্রী ও উদ্ধার অভিযানের জন্য দু’টি হেলিকপ্টার পাঠায়। জাপান জরুরি সহায়তার প্রাথমিক মূল্যায়নের জন্য একটি দল পাঠানোর ঘোষণা দেয়। যদিও অনেক এলাকায় বৃষ্টি কমেছে, কিন্তু মধ্যাঞ্চলের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের বহু সড়ক এখনো অগম্য অবস্থায় রয়েছে।
ডিএমসি’র হালনাগাদ তথ্য বলছে, ঘূর্ণিঝড়-বন্যায় ২০ হাজারের বেশি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার মানুষ। বিভিন্নভাবে সহায়তার প্রয়োজনীয় তালিকায় রয়েছেন ৮ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ।
সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সদস্যরা বেসামরিক কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে মিলে উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছেন। দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুতের লাইন ধসে পড়া এবং পানি শোধনাগার প্লাবিত হওয়ায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ইন্টারনেট যোগাযোগও ভেঙে পড়েছে নানা স্থানে।

২০১৭ সালের পর এবারই এমন ভয়াবহ দুর্যোগের সম্মুখীন হলো শ্রীলঙ্কা। তখনকার বন্যা ও ভূমিধসে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। শতাব্দীর শুরু থেকে সবচেয়ে বড় বন্যা দেখা যায় ২০০৩ সালের জুনে। তখন প্রাণহানি হয়েছিল ২৫৪ জনের।
শ্রীলঙ্কার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দেশের সরকার এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। বন্যার কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ সামগ্রী ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন এনজিও এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও ত্রাণ কার্যক্রমে যোগ দিয়েছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের দ্রুত সহায়তা প্রদান করা যায়।
বন্যার পরবর্তী সময়ে পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন অপরিহার্য।
এদিকে, স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর ঘরবাড়ি পরিষ্কার এবং পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছেন। তবে, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, বন্যার পর পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা রয়েছে। তাই, সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
শ্রীলঙ্কার জনগণ এই কঠিন সময়ে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা তাদের দৃঢ় মনোবল এবং সহমর্মিতার উদাহরণ। এই সংকট মোকাবিলায় তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা দেশটির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তথ্যসহায়তাঃমানবজমিন











