০৫:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

চিকিৎসক সংকটে নাজুক সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্যসেবা, ৩৭১ পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১১২ জন

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময়ঃ ০৪:২৯:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৭ বার পড়া হয়েছে।

 

হকবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট;

সুনামগঞ্জ ।। ২৫ অক্টোবর ২০২৬

 

চিকিৎসকের তীব্র সংকট, শয্যাসংখ্যার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপ এবং নার্সসহ অন্যান্য জনবলের ঘাটতিতে সুনামগঞ্জের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এখন অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পৌঁছে গেছে। প্রায় ২৮ লাখ মানুষের এই জনপদে জেলা সদর হাসপাতালসহ ১২টি উপজেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট ৩৭১টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১১২ জন। অর্থাৎ বর্তমানে ২৫৯টি পদই শূন্য রয়েছে, যা মোট পদের প্রায় ৭০ শতাংশ। জনবল ও অবকাঠামোগত এই সংকটের কারণে প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীদের।

 

সদর হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি চাপ;

জেলার স্বাস্থ্যসেবার মূল কেন্দ্র ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালকে সবচেয়ে বড় চাপ সামলাতে হচ্ছে। ২০০৯ সালে হাসপাতালটিকে ১০০ থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও সেই অনুপাতে জনবল বা সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়নি।

 

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী:

চিকিৎসক সংকট: ৭৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৪ জন, যার মধ্যে ৫০টি মেডিকেল অফিসার পদের বিপরীতে রয়েছেন কেবল ১২ জন। শূন্য রয়েছে ৫০টি পদ।

 

নার্স ও অন্যান্য জনবল: ২৬৩টি নার্স পদের মধ্যে কর্মরত ১৯৬ জন (শূন্য ৬৭টি)। এ ছাড়া মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য ১৩৬টি পদের মধ্যে ১০৮টি পদই ফাঁকা রয়েছে।

রোগীর চাপ: নির্ধারিত ২৫০টি শয্যা থাকলেও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ৯০০-এর বেশি রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর বাইরে বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসছেন আরও কয়েকশ রোগী।

 

মেঝে ও সিঁড়িতে চিকিৎসা, তীব্র হচ্ছে পরিবেশগত দুর্ভোগ;

শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের মেঝে ও সিঁড়ির মুখে অবস্থান করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। একাধিক রোগীকে একই শয্যায় গাদাগাদি করে থাকতে দেখা গেছে। এর ওপর বিভিন্ন ওয়ার্ডে সুপেয় পানির সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া এবং বাথরুম ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

 

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে বাড়ছে জটিলতা;

হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় অর্ধেকই শিশু ও বয়স্ক। অথচ পুরো হাসপাতালে শিশু রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র একজন। এ ছাড়া হৃদরোগ, দন্ত, নাক-কান-গলা, চক্ষু ও হাড়জোড়া (অর্থোপেডিক্স) বিভাগে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় এসব জটিল রোগের রোগীদের সঠিক চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞের অভাবে অনেক রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলার বাইরে অন্যত্র যেতে হচ্ছে, যা দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক ও মানসিক চাপের সৃষ্টি করছে।

 

 

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ আলী আশরাফ সোহাগ বলেন, “হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সের তীব্র সংকট রয়েছে। প্রতিদিন আট থেকে নয় শতাধিক রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন, যার অর্ধেকই শিশু। জনবল ঘাটতি ও অতিরিক্ত চাপের মধ্যেও আমরা সেবা অব্যাহত রেখেছি। তবে পানির সমস্যাসহ কিছু অবকাঠামোগত সমস্যা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে এবং জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”

 

জেলার সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ (রুমি) চিকিৎসক সংকটকে দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “জেলার ১২টি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও একই চিত্র। ডেঙ্গু কিংবা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য আমরা রোগীদের আহ্বান জানাচ্ছি।”

 

সরকারি হাসপাতালগুলোই দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ, শয্যা এবং সুযোগ-সুবিধার অভাবে চিকিৎসা পাওয়া আজ এক কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দাবি—দ্রুত সময়ের মধ্যে চিকিৎসক ও নার্সের শূন্য পদ পূরণ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি এবং পানি ও শৌচাগারের মতো মৌলিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হোক। অন্যথায় সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্যসেবা খাত আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগসঃ

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

চিকিৎসক সংকটে নাজুক সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্যসেবা, ৩৭১ পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১১২ জন

আপডেট সময়ঃ ০৪:২৯:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

 

হকবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট;

সুনামগঞ্জ ।। ২৫ অক্টোবর ২০২৬

 

চিকিৎসকের তীব্র সংকট, শয্যাসংখ্যার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপ এবং নার্সসহ অন্যান্য জনবলের ঘাটতিতে সুনামগঞ্জের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এখন অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পৌঁছে গেছে। প্রায় ২৮ লাখ মানুষের এই জনপদে জেলা সদর হাসপাতালসহ ১২টি উপজেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট ৩৭১টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১১২ জন। অর্থাৎ বর্তমানে ২৫৯টি পদই শূন্য রয়েছে, যা মোট পদের প্রায় ৭০ শতাংশ। জনবল ও অবকাঠামোগত এই সংকটের কারণে প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীদের।

 

সদর হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি চাপ;

জেলার স্বাস্থ্যসেবার মূল কেন্দ্র ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালকে সবচেয়ে বড় চাপ সামলাতে হচ্ছে। ২০০৯ সালে হাসপাতালটিকে ১০০ থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও সেই অনুপাতে জনবল বা সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়নি।

 

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী:

চিকিৎসক সংকট: ৭৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৪ জন, যার মধ্যে ৫০টি মেডিকেল অফিসার পদের বিপরীতে রয়েছেন কেবল ১২ জন। শূন্য রয়েছে ৫০টি পদ।

 

নার্স ও অন্যান্য জনবল: ২৬৩টি নার্স পদের মধ্যে কর্মরত ১৯৬ জন (শূন্য ৬৭টি)। এ ছাড়া মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য ১৩৬টি পদের মধ্যে ১০৮টি পদই ফাঁকা রয়েছে।

রোগীর চাপ: নির্ধারিত ২৫০টি শয্যা থাকলেও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ৯০০-এর বেশি রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর বাইরে বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসছেন আরও কয়েকশ রোগী।

 

মেঝে ও সিঁড়িতে চিকিৎসা, তীব্র হচ্ছে পরিবেশগত দুর্ভোগ;

শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের মেঝে ও সিঁড়ির মুখে অবস্থান করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। একাধিক রোগীকে একই শয্যায় গাদাগাদি করে থাকতে দেখা গেছে। এর ওপর বিভিন্ন ওয়ার্ডে সুপেয় পানির সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া এবং বাথরুম ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

 

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে বাড়ছে জটিলতা;

হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় অর্ধেকই শিশু ও বয়স্ক। অথচ পুরো হাসপাতালে শিশু রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র একজন। এ ছাড়া হৃদরোগ, দন্ত, নাক-কান-গলা, চক্ষু ও হাড়জোড়া (অর্থোপেডিক্স) বিভাগে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় এসব জটিল রোগের রোগীদের সঠিক চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞের অভাবে অনেক রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলার বাইরে অন্যত্র যেতে হচ্ছে, যা দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক ও মানসিক চাপের সৃষ্টি করছে।

 

 

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ আলী আশরাফ সোহাগ বলেন, “হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সের তীব্র সংকট রয়েছে। প্রতিদিন আট থেকে নয় শতাধিক রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন, যার অর্ধেকই শিশু। জনবল ঘাটতি ও অতিরিক্ত চাপের মধ্যেও আমরা সেবা অব্যাহত রেখেছি। তবে পানির সমস্যাসহ কিছু অবকাঠামোগত সমস্যা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে এবং জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”

 

জেলার সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ (রুমি) চিকিৎসক সংকটকে দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “জেলার ১২টি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও একই চিত্র। ডেঙ্গু কিংবা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য আমরা রোগীদের আহ্বান জানাচ্ছি।”

 

সরকারি হাসপাতালগুলোই দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ, শয্যা এবং সুযোগ-সুবিধার অভাবে চিকিৎসা পাওয়া আজ এক কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দাবি—দ্রুত সময়ের মধ্যে চিকিৎসক ও নার্সের শূন্য পদ পূরণ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি এবং পানি ও শৌচাগারের মতো মৌলিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হোক। অন্যথায় সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্যসেবা খাত আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।