বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৯ মাসে নিহত ৪০, রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ গেছে ৭৩ জনের
- আপডেট সময়ঃ ০৩:০২:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৭ বার পড়া হয়েছে।
হকবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট;
সুনামগঞ্জ ।। ২১ অক্টোবর ২০২৬
চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর) সারাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় শিশু ও সাধারণ মানুষসহ মোট ৭৩ জন নিহত হয়েছেন। তবে এই সময়ের রাজনৈতিক সংঘাতকে ছাড়িয়ে গেছে অনাকাঙ্ক্ষিত গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা। একই সময়ে মব জাস্টিস ও গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়েছে ১৮৭ জনের, যা রাজনৈতিক সহিংসতার প্রাণহানির তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি।
সোমবার মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ৯ মাসের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। দেশের ১৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর এবং সংস্থাটির সংগৃহীত নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৯ মাসে সারাদেশে ১ হাজার ১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বড় অংশই ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দলটির মুখোমুখি সংঘর্ষ। বিস্তারিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিএনপির অভ্যন্তরীণ ৩৪২টি সংঘাতের ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও আড়াই হাজারের বেশি মানুষ আহত হন।
এছাড়া বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার ৩২১টি সংঘর্ষে ১১ জন এবং বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ৯৩টি সংঘাতের ঘটনায় ৯ জন প্রাণ হারান। আধিপত্য বিস্তার, স্থানীয় নির্বাচন ও সমাবেশ ঘিরে সহিংসতা, চাঁদাবাজি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘরে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ ছিল এসব সংঘাতের মূল কারণ। রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিহত ৭৩ জনের মধ্যে ৪৬ জনই বিএনপির, ৮ জন জামায়াতে ইসলামীর, ৬ জন কার্যাক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এবং ১ জন চরমপন্থি দলের সদস্য।
অন্যদিকে, দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ফুটিয়ে তুলেছে গণপিটুনির সংখ্যা। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও ধর্ষণের মতো অভিযোগ এবং নানা গুজবের জেরে সারাদেশে ৩৯৮টি মব সহিংসতার ঘটনায় ১৮৭ জনের করুণ মৃত্যু ঘটে, যেখানে আহত হয়েছেন আরও অন্তত চার শতাধিক মানুষ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, গ্রেপ্তার ও কারাফাটকের চিত্রও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই ৯ মাসে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ২৭০টিরও বেশি মামলা হয়েছে, যেখানে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার নামীয় এবং প্রায় সাড়ে বত্রিশ হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়মিত অভিযানে ৬৩ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতন, গুলি ও তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় অন্তত ১৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। পাশাপাশি দেশের বিচারিক হেফাজতে থাকা ৯৫ জন আসামির মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৪০ জন কয়েদি এবং ৫৫ জন হাজতি।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও এক অস্বস্তিকর চিত্র তুলে ধরেছে এইচআরএসএস। ৯ মাসে বিভিন্ন কর্মসূচীতে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ৪৩৯ জন আহত ও ৪৬ জন আটক হন। একই সময়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ২৮৮টি পৃথক ঘটনায় অন্তত ৫১৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন, যার মধ্যে ২০ জন সাংবাদিককে বিভিন্ন সময়ে আটক করা হয়েছিল।
সামাজিক ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সারাদেশে বিগত ৯ মাসে আড়াই হাজারেরও বেশি নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ৫৮২টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ১৪৫ জন শ্রমিক নিহত ও সহস্রাধিক আহত হন। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চালানো ৫৬টি হামলার ঘটনায় ৬২ জন আহত হওয়ার পাশাপাশি বেশ কিছু মন্দির, প্রতিমা ও বসতবাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক সীমান্তেও বিএসএফের হামলায় ১৩ জন এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সংঘাত ও গুলিবর্ষণে ১ জন বাংলাদেশি নিহত হন।
দেশের এমন অস্থির মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। তিনি স্পষ্ট জানান, রাজনৈতিক সংঘাত, গণপিটুনি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন বন্ধে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আইন হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা এবং সহিংসতা কঠোর হস্তে দমন করা না গেলে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটার মারাত্মক আশঙ্কা রয়ে যায়।




















