০৫:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে, ঔষধ নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড

হক বার্তা ডেস্ক রিপোর্টঃ
  • আপডেট সময়ঃ ০৮:২০:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / ২৪০ বার পড়া হয়েছে।

‎সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে প্রায় আড়াই কোটি টাকার ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। গেল দুইদিন ধরে এই অস্বাভাবিক তথ্য প্রচার হয়। এই ঘটনায় বুধবার বিকালে ১০ সদস্যের তদন্ত কমিটি করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কীভাবে এই ওষুধ গোডাউনে গেছে, এই তথ্যের কোন ডকুমেন্ট  দেখাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

‎হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ না দিয়ে বাইরে ওষুধ পাচার হয় এমন তথ্য সম্প্রতি দুদকের অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে। যা দুদক কর্মকর্তারা গণমাধ্যম কর্মীদের সম্প্রতি (গত ২৬ মে) জানিয়েছিলেন।

‎সেবা নিতে আসা রোগীদের না দেওয়ায় ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে দাবি সেবা গ্রহিতাদের। এতে কেবল সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। এছাড়াও স্টোর কিপারের পদে একজন থাকলেও স্টোরের দায়িত্ব পালন করছেন মেডিকেল টেকনেশিয়ান, সিনিয়ার স্টাফ নার্স পদের সাত জন।

‎সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের প্রতিদিন সেবা নিতে আসেন হাজারো মানুষ। হাসপাতালে ভর্তি থাকা তিনশ রোগী সেবা নেন প্রতিদিন। সেবা নিতে আসা এসব রোগীদের বেশির ভাগ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে, অথচ হাসপাতালেই প্রতিবছর কোটি টাকার ওষুধ কেনা হয়।

‎রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ না দেওয়ার কারণে প্রায় ২ কোটি ৪০ লক্ষ টাকার মূল্যের ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। কেনো এই জীবন রক্ষাকারী ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে এবং পরবর্তী করণীয় জানতে বুধবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ১০ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি করে দিয়েছেন। এই কমিটির প্রধান হয়েছেন হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আশুতোষ সিংহ। আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন দাখিলের কথা বলা হয়েছে।

‎এবিষয়ে হাসপাতালে গিয়ে ছবি ও তথ্য নিতে চাইলে নানা অজুহাত দেখিয়ে বিদায় করার চেষ্টা করা হয় এই প্রতিবেদকসহ দুইজন সাংবাদিককে। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রফিকুল ইসলাম নিজেও এমন চেষ্টা করেন। ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. সুমন বণিকের অনুমতি ছাড়া কোনো ছবি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া যাবে না বলে জানান তিনি। তবে তিনি স্বীকার করেছেন হাসপাতালের স্টোর রুমে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রয়েছে।

‎হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. সুমন বণিক অফিসের কাজে ঢাকা থাকায় দায়িত্বে থাকা সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. বিষ্ণু প্রসাদ চন্দের কাছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের ছবি ও তথ্য চাইলে, তিনিও অপারগতা জানালেন। এক পর্যায়ে এই প্রতিবেদকে বলেন, তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। এ নিয়ে অভ্যন্তরীণ সভা হয়েছে। সকল তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে জানালে, তিনি স্টোর রুম খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে সহযোগিতা করেন।

‎আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রফিকুল ইসলামের অফিসের পাশেই স্টোর রুমে পাওয়া যায় কার্টনে কার্টন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। এসব কার্টন ভর্তি ওষুধের কোনোটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ৬ মাস আগে। আবার কোনোটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে। এসব ওষুধের ছবি তোলার সময় হঠাৎ স্টোর রুমে এসে হাজির হন আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রফিকুল ইসলাম। দায়িত্বে থাকা স্টোর কিপার রাজন দে’র কাছে জানতে চান, কার অনুমতি নিয়ে স্টোর রুমের তালা খোলা হয়েছে। স্টোর কিপার রাজন দে’র উত্তরে ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. বিষ্ণু প্রসাদ চন্দের কথা শুনে চলে যান আবাসিক মেডিকেল অফিসার।

‎এরপর হাসপাতালের পুরাতন ভবনের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে মিললো এরচেয়ে দ্বিগুণ মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। এসব ওষুধের মেয়াদও এক বছর আগে থেকে দুইদিন আগেও কোন কোনটির মেয়াদ শেষ হয়েছে।

‎স্টোর কিপারের দায়িত্বে থাকা রাজন দে জানান, তিনি মূলত এনেসথেসিয়া টেকনিশিয়ান (মেডিকেল টেকনিশিয়ান)। তিনি স্টোরের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।

‎খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালের স্টোরের দায়িত্বে রাজন দে’সহ আরও ৭ জন রয়েছেন।

‎এদের মধ্যে রয়েছেন সিনিয়র স্টাফ নার্স সোহেল আহমেদ, আতিক আহমদ, মুবিন আনসারী, মেডিকেল টেকনিশিয়ান সাদেক আহমদ, রুম্মান মিয়া ও পিযুষ দেবনাথ। তবে হাসপাতালের স্টোর কিপার রুপম কুমার দাস জানালেন, তিনি চলতি বছরের মার্চ মাসে হাসপাতালে যোগদান করেছেন। তিনি হাসপাতালের আসার পর দায়িত্ব সমঝে দেওয়া হয় নি। তার দায়িত্ব পালন করছেন হাসপাতালের অন্য দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

‎যে ওষুধগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে সেগুলো হলো, Syp. Kitomar রয়েছে ১ হাজার পিস। এটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে। Tab. Cefuroxime 250mg রয়েছে ৫০ হাজার ৭৫০ টি। Tab. Bisoprolol 5mg রয়েছে ২২ হাজার ৩২০ টি। Tab. Montelukas 10mg রয়েছে ছয় হাজার। Tab. Montelukas 4mg রয়েছে এক লক্ষ পিস। Tab. N-Bion রয়েছে ১৬ হাজার পিস। Tab. Rosuba 5mg রয়েছে ৫৩ হাজার ছয়শ’ পিস। Tab. Fexofenadin 120mg রয়েছে ২২ হাজার চারশ’ পিস। Tab. Naproxen 500mg রয়েছে দুই লাখ ৫২ হাজার চারশ’ পিস। Tab. Atorvastatin 10mg রয়েছে তিন লাখ ৬৭ হাজার পিস। Tab. Rabeprazole 20mg রয়েছে ১০ হাজার পিস। এই ওষুধগুলোর মেয়াদ শেষ হয়েছে গেল এপ্রিল মাসে। Tab. Glucozid 80mg রয়েছে ২৫ হাজার ৬শ পিস। Tab. Lopiral Plus 75mg রয়েছে আট লাখ ৯১ হাজার পিস। এই দুই রকমের ওষুদের মেয়াদ শেষ হয়েছে বিগত মার্চ মাসে। Inj. Ceftriaxone 250mg রয়েছে ২২ হাজার পিস। এটির মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের জুন মাসে। Tab. Esoral 20mg রয়েছে ১৮ হাজার নয়শ’ পিস। এটির মেয়াদ শেষ হয়েছে দুইদিন আগে (৩১ আগস্ট পর্যন্ত ছিল মেয়াদ)। এই পনেরো পদের ওষুধগুলোর বাজার মূল্য প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা। এই তালিকার বাইরেও আরও অনেক মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রয়েছে হাসপাতালের স্টোর রুমে।

‎সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বড়পাড়ার বাসিন্দা হোসনে খা বলেন, হাড় ব্যাথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। হাসপাতাল থেকে দুই রকমের ওষুধ দিয়ে বলেছে তিনটি স্যালাইন বাইরের ফার্মেসী থেকে কিনে আনতে। পরে তিনশ’ টাকা দিয়ে তিনটি স্যালাইন কিনতে হয়েছে।

‎সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নীলপুর গ্রামের বাসিন্দা সাফতেরা বেগম বলেন, হাসপাতালে ভর্তি থেকেও বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। হাসপাতালে আসার পর একটি ক্যানুলা দিয়েছে আর প্রতি ওয়াক্ত একটি করে প্যারাসিটামল দিচ্ছে। বাকী ১২শ’ টাকার ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছে।

‎গৌরারং ইউনিয়নের কান্দিগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আবুল লেইস বলেন, হাসপাতাল থেকে স্যালাইন কিনে আনতে বলেছে। আমরা বলেছি হাসপাতাল থেকে দিতে। তারা বলেছে হাসপাতালে নেই, বাইরে থেকে কিনতে হবে।

‎মুজাহিদুল ইসলাম মজনু নামের একজন ওষুধ ব্যবসায়ী বললেন, স্টোরে কোটি টাকার ওষুধের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। অবহেলিত একটি এলাকা সুনামগঞ্জ। এখানে প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় হাজার রোগী আউটডোরে সেবা নেন। হাসপাতালে ভর্তি থেকেও সেবা নেন বহুরোগী। এতো এতো রোগী আসার পরেও কেনো কোটি কোটি টাকার ওষুধের মেয়াদোত্তীর্ণ হলো তা উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে খোঁজে বের করার দাবি জানাচ্ছি।

‎ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. বিষ্ণু প্রসাদ চন্দ বলেন, এটি অস্বাভাবিক ঘটনা, এতো টাকার ওষুধ কিভাবে নষ্ট হলো, কিভাবে এলো প্রশ্ন রয়েছে। এবিষয়ে হাতপাতালের তত্ত্বাবধায়ক তদন্ত কমিটি করেছেন।

‎তিনি আরও বলেন, স্টোর কিপারকে এবিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, স্টোর কিপার জানিয়েছে, ‘স্টোরের এসব ওষুধের কোনো ডকুমেন্টস নেই। ডকুমেন্টস না থাকলে এগুলো স্টোরের বাইরে কিভাবে নেবে? এবিষয়টি তত্ত্বাবধায়কে জানানো হয়েছে। স্টোরের বাইরে ওষুধগুলো রোগীদের দেওয়ার জন্য কোনো নির্দেশ দেওয়া হয় নি।’

‎তার মতে (ডা. বিষ্ণু প্রসাদ) এগুলো দেওয়া হলে রোগীদের উপকারে আসতো, নষ্টও হতো না এতোগুলো ওষুধ।

‎হাসপাতালের স্টোর কিপার পদে একজন থাকলেও কেনো দায়িত্ব হস্তান্তর না করে  মেডিকেল টেকনেশিয়ান, সিনিয়র স্টাফ নার্স পদের ৭ জন দায়িত্ব পালন করছেন এবিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগের তত্ত্বাবধায়ক কাজের বিকেন্দ্রীকরণের জন্য ওদের (এই সাতজন) দায়িত্ব দিয়েছিলেন, এর বাইরে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান নি।

‎হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. সুমন বণিক বললেন, আগের তত্ত্বাবধায়ক বদলি ও নতুন তত্ত্বাবধায়ক যোগদান না করায় আমি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্বে রয়েছি। ওষুধগুলো অনেক আগে কেনা হয়েছে। এবিষয়ে একটি কমিটি করা হয়েছে। এখন করণীয় বিষয়ে কমিটি সিদ্ধান্ত দেবে।

‎হাসপাতালের সদ্য বদলি (১০ আগস্ট ২০২৫) হওয়া তত্ত্বাবধায়ক ডা. মাহবুবুর রহমান বললেন, মেয়াদোত্তীর্ণ যে ওষুধ নিয়ে কমিটি হয়েছে। সেগুলো ২০২৪ এর মে মাসে আমি যোগদানের সময় বুঝিয়ে দেওয়া হয় নি। আমি আসার আগে সেগুলো কেনা হয়েছিল। আমি দায়িত্ব নেবার পর নানা ঝামেলায় কাটাতে হয়েছে। আমি যখন ব্যবস্থা নেবার জন্য কমিটি করতে উদ্যোগ নিয়েছিলাম, তখনই আমার বদলির আদেশ হওয়ায়, এ নিয়ে আমি কিছুই করতে পারি নি।’

‎এর আগের তত্ত্বাবধায়ক (বর্তমানে স্বাস্থ্য বিভাগের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক) ডা. আনিসুর রহমানের সরকারি ও ব্যক্তিগত মোবাইলে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেন নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া না দেওয়ায় তাঁর বক্তব্য সংযুক্ত করা যায় নি।

 

সুত্রঃsunamganjerkhobor.com

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে, ঔষধ নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড

আপডেট সময়ঃ ০৮:২০:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫

‎সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে প্রায় আড়াই কোটি টাকার ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। গেল দুইদিন ধরে এই অস্বাভাবিক তথ্য প্রচার হয়। এই ঘটনায় বুধবার বিকালে ১০ সদস্যের তদন্ত কমিটি করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কীভাবে এই ওষুধ গোডাউনে গেছে, এই তথ্যের কোন ডকুমেন্ট  দেখাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

‎হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ না দিয়ে বাইরে ওষুধ পাচার হয় এমন তথ্য সম্প্রতি দুদকের অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে। যা দুদক কর্মকর্তারা গণমাধ্যম কর্মীদের সম্প্রতি (গত ২৬ মে) জানিয়েছিলেন।

‎সেবা নিতে আসা রোগীদের না দেওয়ায় ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে দাবি সেবা গ্রহিতাদের। এতে কেবল সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। এছাড়াও স্টোর কিপারের পদে একজন থাকলেও স্টোরের দায়িত্ব পালন করছেন মেডিকেল টেকনেশিয়ান, সিনিয়ার স্টাফ নার্স পদের সাত জন।

‎সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের প্রতিদিন সেবা নিতে আসেন হাজারো মানুষ। হাসপাতালে ভর্তি থাকা তিনশ রোগী সেবা নেন প্রতিদিন। সেবা নিতে আসা এসব রোগীদের বেশির ভাগ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে, অথচ হাসপাতালেই প্রতিবছর কোটি টাকার ওষুধ কেনা হয়।

‎রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ না দেওয়ার কারণে প্রায় ২ কোটি ৪০ লক্ষ টাকার মূল্যের ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। কেনো এই জীবন রক্ষাকারী ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে এবং পরবর্তী করণীয় জানতে বুধবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ১০ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি করে দিয়েছেন। এই কমিটির প্রধান হয়েছেন হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আশুতোষ সিংহ। আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন দাখিলের কথা বলা হয়েছে।

‎এবিষয়ে হাসপাতালে গিয়ে ছবি ও তথ্য নিতে চাইলে নানা অজুহাত দেখিয়ে বিদায় করার চেষ্টা করা হয় এই প্রতিবেদকসহ দুইজন সাংবাদিককে। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রফিকুল ইসলাম নিজেও এমন চেষ্টা করেন। ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. সুমন বণিকের অনুমতি ছাড়া কোনো ছবি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া যাবে না বলে জানান তিনি। তবে তিনি স্বীকার করেছেন হাসপাতালের স্টোর রুমে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রয়েছে।

‎হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. সুমন বণিক অফিসের কাজে ঢাকা থাকায় দায়িত্বে থাকা সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. বিষ্ণু প্রসাদ চন্দের কাছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের ছবি ও তথ্য চাইলে, তিনিও অপারগতা জানালেন। এক পর্যায়ে এই প্রতিবেদকে বলেন, তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। এ নিয়ে অভ্যন্তরীণ সভা হয়েছে। সকল তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে জানালে, তিনি স্টোর রুম খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে সহযোগিতা করেন।

‎আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রফিকুল ইসলামের অফিসের পাশেই স্টোর রুমে পাওয়া যায় কার্টনে কার্টন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। এসব কার্টন ভর্তি ওষুধের কোনোটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ৬ মাস আগে। আবার কোনোটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে। এসব ওষুধের ছবি তোলার সময় হঠাৎ স্টোর রুমে এসে হাজির হন আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রফিকুল ইসলাম। দায়িত্বে থাকা স্টোর কিপার রাজন দে’র কাছে জানতে চান, কার অনুমতি নিয়ে স্টোর রুমের তালা খোলা হয়েছে। স্টোর কিপার রাজন দে’র উত্তরে ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. বিষ্ণু প্রসাদ চন্দের কথা শুনে চলে যান আবাসিক মেডিকেল অফিসার।

‎এরপর হাসপাতালের পুরাতন ভবনের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে মিললো এরচেয়ে দ্বিগুণ মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। এসব ওষুধের মেয়াদও এক বছর আগে থেকে দুইদিন আগেও কোন কোনটির মেয়াদ শেষ হয়েছে।

‎স্টোর কিপারের দায়িত্বে থাকা রাজন দে জানান, তিনি মূলত এনেসথেসিয়া টেকনিশিয়ান (মেডিকেল টেকনিশিয়ান)। তিনি স্টোরের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।

‎খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালের স্টোরের দায়িত্বে রাজন দে’সহ আরও ৭ জন রয়েছেন।

‎এদের মধ্যে রয়েছেন সিনিয়র স্টাফ নার্স সোহেল আহমেদ, আতিক আহমদ, মুবিন আনসারী, মেডিকেল টেকনিশিয়ান সাদেক আহমদ, রুম্মান মিয়া ও পিযুষ দেবনাথ। তবে হাসপাতালের স্টোর কিপার রুপম কুমার দাস জানালেন, তিনি চলতি বছরের মার্চ মাসে হাসপাতালে যোগদান করেছেন। তিনি হাসপাতালের আসার পর দায়িত্ব সমঝে দেওয়া হয় নি। তার দায়িত্ব পালন করছেন হাসপাতালের অন্য দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

‎যে ওষুধগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে সেগুলো হলো, Syp. Kitomar রয়েছে ১ হাজার পিস। এটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে। Tab. Cefuroxime 250mg রয়েছে ৫০ হাজার ৭৫০ টি। Tab. Bisoprolol 5mg রয়েছে ২২ হাজার ৩২০ টি। Tab. Montelukas 10mg রয়েছে ছয় হাজার। Tab. Montelukas 4mg রয়েছে এক লক্ষ পিস। Tab. N-Bion রয়েছে ১৬ হাজার পিস। Tab. Rosuba 5mg রয়েছে ৫৩ হাজার ছয়শ’ পিস। Tab. Fexofenadin 120mg রয়েছে ২২ হাজার চারশ’ পিস। Tab. Naproxen 500mg রয়েছে দুই লাখ ৫২ হাজার চারশ’ পিস। Tab. Atorvastatin 10mg রয়েছে তিন লাখ ৬৭ হাজার পিস। Tab. Rabeprazole 20mg রয়েছে ১০ হাজার পিস। এই ওষুধগুলোর মেয়াদ শেষ হয়েছে গেল এপ্রিল মাসে। Tab. Glucozid 80mg রয়েছে ২৫ হাজার ৬শ পিস। Tab. Lopiral Plus 75mg রয়েছে আট লাখ ৯১ হাজার পিস। এই দুই রকমের ওষুদের মেয়াদ শেষ হয়েছে বিগত মার্চ মাসে। Inj. Ceftriaxone 250mg রয়েছে ২২ হাজার পিস। এটির মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের জুন মাসে। Tab. Esoral 20mg রয়েছে ১৮ হাজার নয়শ’ পিস। এটির মেয়াদ শেষ হয়েছে দুইদিন আগে (৩১ আগস্ট পর্যন্ত ছিল মেয়াদ)। এই পনেরো পদের ওষুধগুলোর বাজার মূল্য প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা। এই তালিকার বাইরেও আরও অনেক মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রয়েছে হাসপাতালের স্টোর রুমে।

‎সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বড়পাড়ার বাসিন্দা হোসনে খা বলেন, হাড় ব্যাথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। হাসপাতাল থেকে দুই রকমের ওষুধ দিয়ে বলেছে তিনটি স্যালাইন বাইরের ফার্মেসী থেকে কিনে আনতে। পরে তিনশ’ টাকা দিয়ে তিনটি স্যালাইন কিনতে হয়েছে।

‎সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নীলপুর গ্রামের বাসিন্দা সাফতেরা বেগম বলেন, হাসপাতালে ভর্তি থেকেও বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। হাসপাতালে আসার পর একটি ক্যানুলা দিয়েছে আর প্রতি ওয়াক্ত একটি করে প্যারাসিটামল দিচ্ছে। বাকী ১২শ’ টাকার ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছে।

‎গৌরারং ইউনিয়নের কান্দিগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আবুল লেইস বলেন, হাসপাতাল থেকে স্যালাইন কিনে আনতে বলেছে। আমরা বলেছি হাসপাতাল থেকে দিতে। তারা বলেছে হাসপাতালে নেই, বাইরে থেকে কিনতে হবে।

‎মুজাহিদুল ইসলাম মজনু নামের একজন ওষুধ ব্যবসায়ী বললেন, স্টোরে কোটি টাকার ওষুধের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। অবহেলিত একটি এলাকা সুনামগঞ্জ। এখানে প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় হাজার রোগী আউটডোরে সেবা নেন। হাসপাতালে ভর্তি থেকেও সেবা নেন বহুরোগী। এতো এতো রোগী আসার পরেও কেনো কোটি কোটি টাকার ওষুধের মেয়াদোত্তীর্ণ হলো তা উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে খোঁজে বের করার দাবি জানাচ্ছি।

‎ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. বিষ্ণু প্রসাদ চন্দ বলেন, এটি অস্বাভাবিক ঘটনা, এতো টাকার ওষুধ কিভাবে নষ্ট হলো, কিভাবে এলো প্রশ্ন রয়েছে। এবিষয়ে হাতপাতালের তত্ত্বাবধায়ক তদন্ত কমিটি করেছেন।

‎তিনি আরও বলেন, স্টোর কিপারকে এবিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, স্টোর কিপার জানিয়েছে, ‘স্টোরের এসব ওষুধের কোনো ডকুমেন্টস নেই। ডকুমেন্টস না থাকলে এগুলো স্টোরের বাইরে কিভাবে নেবে? এবিষয়টি তত্ত্বাবধায়কে জানানো হয়েছে। স্টোরের বাইরে ওষুধগুলো রোগীদের দেওয়ার জন্য কোনো নির্দেশ দেওয়া হয় নি।’

‎তার মতে (ডা. বিষ্ণু প্রসাদ) এগুলো দেওয়া হলে রোগীদের উপকারে আসতো, নষ্টও হতো না এতোগুলো ওষুধ।

‎হাসপাতালের স্টোর কিপার পদে একজন থাকলেও কেনো দায়িত্ব হস্তান্তর না করে  মেডিকেল টেকনেশিয়ান, সিনিয়র স্টাফ নার্স পদের ৭ জন দায়িত্ব পালন করছেন এবিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগের তত্ত্বাবধায়ক কাজের বিকেন্দ্রীকরণের জন্য ওদের (এই সাতজন) দায়িত্ব দিয়েছিলেন, এর বাইরে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান নি।

‎হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. সুমন বণিক বললেন, আগের তত্ত্বাবধায়ক বদলি ও নতুন তত্ত্বাবধায়ক যোগদান না করায় আমি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্বে রয়েছি। ওষুধগুলো অনেক আগে কেনা হয়েছে। এবিষয়ে একটি কমিটি করা হয়েছে। এখন করণীয় বিষয়ে কমিটি সিদ্ধান্ত দেবে।

‎হাসপাতালের সদ্য বদলি (১০ আগস্ট ২০২৫) হওয়া তত্ত্বাবধায়ক ডা. মাহবুবুর রহমান বললেন, মেয়াদোত্তীর্ণ যে ওষুধ নিয়ে কমিটি হয়েছে। সেগুলো ২০২৪ এর মে মাসে আমি যোগদানের সময় বুঝিয়ে দেওয়া হয় নি। আমি আসার আগে সেগুলো কেনা হয়েছিল। আমি দায়িত্ব নেবার পর নানা ঝামেলায় কাটাতে হয়েছে। আমি যখন ব্যবস্থা নেবার জন্য কমিটি করতে উদ্যোগ নিয়েছিলাম, তখনই আমার বদলির আদেশ হওয়ায়, এ নিয়ে আমি কিছুই করতে পারি নি।’

‎এর আগের তত্ত্বাবধায়ক (বর্তমানে স্বাস্থ্য বিভাগের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক) ডা. আনিসুর রহমানের সরকারি ও ব্যক্তিগত মোবাইলে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেন নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া না দেওয়ায় তাঁর বক্তব্য সংযুক্ত করা যায় নি।

 

সুত্রঃsunamganjerkhobor.com