০২:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬

মৃত ধরে নিয়েছিল পরিবার, ১৮ বছর পর জীবিত ফিরলেন আলমগীর

হকবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময়ঃ ০১:০৭:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৯ বার পড়া হয়েছে।

‎হকবার্তা ডেস্ক:

‎০১ আগস্ট ২০২৬

‎নিখোঁজের দীর্ঘ ১৮ বছর পর নিজের ভিটেমাটিতে ফিরেছেন আলমগীর হাওলাদার। কিন্তু যে ঘরে ফেরার স্বপ্ন তিনি এতদিন বুকে লালন করেছেন, সেখানে নেই তার অপেক্ষায় থাকা বাবা-মা। নেই স্ত্রী, নেই সেই ছোট্ট মেয়েটিও যাকে কোলে নিয়ে তিনি একদিন জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন।

 

‎আলমগীর হাওলাদারের বাড়ি পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ছোট টেংরা গ্রামে। তার বাবার নাম মৃত সিকান্দার আলী হাওলাদার।

‎স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালে অভাবের তাড়নায় স্ত্রী আমেনা বেগম ও ছোট মেয়ে খাদিজা কে নিয়ে ঢাকায় চলে যান আলমগীর। সেখানে তিনি দৈনিক শ্রমিকের কাজ করতেন, আর তার স্ত্রী কাজ করতেন একটি গার্মেন্টেস-এ। সংসারের চাকা সচল রাখতে ব্যস্ত থাকা আলমগীরের জীবনেই নেমে আসে এক অন্ধকার অধ্যায়।

‎২০০৮ সালের নভেম্বর মাসের একদিন ঢাকার পোস্তগোলা এলাকায় কাজের সন্ধানে বের হলে একটি অপহরণকারী চক্র তাকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। গাড়িতে ওঠানোর পর তার হাত-পা ও চোখ বেঁধে ফেলা হয়। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় অজ্ঞাত একটি স্থানে উঁচু দেয়ালঘেরা একটি প্রতিষ্ঠানে।

‎আলমগীরের দাবি, সেখানে তার মতো আরও প্রায় ৩০ জন মানুষ ছিলেন। তাদের দিয়ে প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করানো হতো, কিন্তু কোনো বেতন বা ভাতা দেওয়া হতো না। পর্যাপ্ত খাবারও দেওয়া হতো না। ভালো খাবার বলতে মাঝে মাঝে ডাল (পাতলা ঝোল) ও আলু ভর্তাই ছিল তাদের ভরসা। এভাবেই কেটে যায় তার জীবনের ১৮টি বছর।

‎এদিকে দীর্ঘদিন খোঁজ করেও আলমগীরের সন্ধান না পেয়ে তার স্ত্রী আমেনা বেগম অন্যত্র বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেন। একমাত্র মেয়ে খাদিজা বেগম বাবার অনুপস্থিতিতে নানা মানুষের বাড়িতে ঝি এর কাজ করে বড় হয়েছেন। পরে তারও বিয়ে হয়ে গেছে। কোথায় বিয়ে হয়েছে, তা-ও জানেন না আলমগীর।

‎সন্তানের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে পাঁচ বছর আগে মারা যান আলমগীরের বাবা-মা। ছেলের ফিরে আসার খবর তারা আর শুনতে পারেননি। বর্তমানে আলমগীরের সংসারে রয়েছেন শুধু এক ভাই, তিনিও নিজের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। দীর্ঘ নির্যাতন ও মানসিক আঘাতে গ্রামের বাড়িতে ফেরার পর আলমগীর বেশিরভাগ সময় নীরব থাকেন। তাকে দেখে মনে হয়, তিনি যেন হারিয়ে ফেলেছেন স্বাভাবিক জীবনের অনেক কিছুই।

‎সদ্য বাড়ি ফেরা আলমগীরের ভাষ্য, গত ২৮ জুলাই গভীর রাতে ঢাকার পোস্তগোলা ব্রিজের পাশে আলমগীরসহ ৩০ জনকে চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। সকালে তারা যে যার মতো বিভিন্ন স্থানে চলে যান। আলমগীরের পকেটে কোনো টাকা না থাকায় রাস্তায় ঘুরতে থাকা এক ব্যক্তি এক দিনের জন্য বালুর জাহাজে ৫০০ টাকা মজুরিতে কাজ দেন। সেই টাকা দিয়েই কোনো রকমে তিনি ফিরে আসেন নিজের জন্মভূমি পাথরঘাটায়।

‎২৯ জুলাই বাড়িতে পৌঁছালে স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর মধ্যে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিস্থিতি। দীর্ঘদিন পর হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরে পেয়ে অনেকে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

‎কীভাবে ছাড়া পেলেন প্রশ্নের জবাবে আলমগীর দাবি করেন, সরকার পরিবর্তনের পর সম্ভবত অপহরণকারীরা নিজেদের বাঁচাতে ভয় পেয়ে আমাদের ছেড়ে দিয়েছে।

‎এদিকে আলমগীরকে মৃত ভেবে তার পরিবার ও এলাকাবাসী বিভিন্ন সময় মিলাদ, দোয়া মাহফিল এবং মসজিদে দোয়ার আয়োজন করেছিলেন। এমনকি তার স্মরণে কাঙালি ভোজেরও আয়োজন করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী।

‎বিএনপির সাবেক উপজেলা যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান সাহেদ জানান, প্রায় ১৮ বছর তিনি নিখোঁজ ছিলেন। তাকে মৃত ভেবে বিভিন্ন সময় দোয়া মাহফিলের আয়োজনও করা হয়েছে। সম্প্রতি বাড়ি ফিরে আসার খবরে সবাই খুশি হয়েছেন। তিনি দাবি করছেন তাকে আটকে রেখে জোরপূর্বক পরিশ্রমের কাজ করানো হয়েছিল। তিনি ফিরে আসার পর আমরা তাকে পাথরঘাটা হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। চিকিৎসা শেষে তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছি ।

ট্যাগসঃ

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

মৃত ধরে নিয়েছিল পরিবার, ১৮ বছর পর জীবিত ফিরলেন আলমগীর

আপডেট সময়ঃ ০১:০৭:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬

‎হকবার্তা ডেস্ক:

‎০১ আগস্ট ২০২৬

‎নিখোঁজের দীর্ঘ ১৮ বছর পর নিজের ভিটেমাটিতে ফিরেছেন আলমগীর হাওলাদার। কিন্তু যে ঘরে ফেরার স্বপ্ন তিনি এতদিন বুকে লালন করেছেন, সেখানে নেই তার অপেক্ষায় থাকা বাবা-মা। নেই স্ত্রী, নেই সেই ছোট্ট মেয়েটিও যাকে কোলে নিয়ে তিনি একদিন জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন।

 

‎আলমগীর হাওলাদারের বাড়ি পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ছোট টেংরা গ্রামে। তার বাবার নাম মৃত সিকান্দার আলী হাওলাদার।

‎স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালে অভাবের তাড়নায় স্ত্রী আমেনা বেগম ও ছোট মেয়ে খাদিজা কে নিয়ে ঢাকায় চলে যান আলমগীর। সেখানে তিনি দৈনিক শ্রমিকের কাজ করতেন, আর তার স্ত্রী কাজ করতেন একটি গার্মেন্টেস-এ। সংসারের চাকা সচল রাখতে ব্যস্ত থাকা আলমগীরের জীবনেই নেমে আসে এক অন্ধকার অধ্যায়।

‎২০০৮ সালের নভেম্বর মাসের একদিন ঢাকার পোস্তগোলা এলাকায় কাজের সন্ধানে বের হলে একটি অপহরণকারী চক্র তাকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। গাড়িতে ওঠানোর পর তার হাত-পা ও চোখ বেঁধে ফেলা হয়। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় অজ্ঞাত একটি স্থানে উঁচু দেয়ালঘেরা একটি প্রতিষ্ঠানে।

‎আলমগীরের দাবি, সেখানে তার মতো আরও প্রায় ৩০ জন মানুষ ছিলেন। তাদের দিয়ে প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করানো হতো, কিন্তু কোনো বেতন বা ভাতা দেওয়া হতো না। পর্যাপ্ত খাবারও দেওয়া হতো না। ভালো খাবার বলতে মাঝে মাঝে ডাল (পাতলা ঝোল) ও আলু ভর্তাই ছিল তাদের ভরসা। এভাবেই কেটে যায় তার জীবনের ১৮টি বছর।

‎এদিকে দীর্ঘদিন খোঁজ করেও আলমগীরের সন্ধান না পেয়ে তার স্ত্রী আমেনা বেগম অন্যত্র বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেন। একমাত্র মেয়ে খাদিজা বেগম বাবার অনুপস্থিতিতে নানা মানুষের বাড়িতে ঝি এর কাজ করে বড় হয়েছেন। পরে তারও বিয়ে হয়ে গেছে। কোথায় বিয়ে হয়েছে, তা-ও জানেন না আলমগীর।

‎সন্তানের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে পাঁচ বছর আগে মারা যান আলমগীরের বাবা-মা। ছেলের ফিরে আসার খবর তারা আর শুনতে পারেননি। বর্তমানে আলমগীরের সংসারে রয়েছেন শুধু এক ভাই, তিনিও নিজের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। দীর্ঘ নির্যাতন ও মানসিক আঘাতে গ্রামের বাড়িতে ফেরার পর আলমগীর বেশিরভাগ সময় নীরব থাকেন। তাকে দেখে মনে হয়, তিনি যেন হারিয়ে ফেলেছেন স্বাভাবিক জীবনের অনেক কিছুই।

‎সদ্য বাড়ি ফেরা আলমগীরের ভাষ্য, গত ২৮ জুলাই গভীর রাতে ঢাকার পোস্তগোলা ব্রিজের পাশে আলমগীরসহ ৩০ জনকে চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। সকালে তারা যে যার মতো বিভিন্ন স্থানে চলে যান। আলমগীরের পকেটে কোনো টাকা না থাকায় রাস্তায় ঘুরতে থাকা এক ব্যক্তি এক দিনের জন্য বালুর জাহাজে ৫০০ টাকা মজুরিতে কাজ দেন। সেই টাকা দিয়েই কোনো রকমে তিনি ফিরে আসেন নিজের জন্মভূমি পাথরঘাটায়।

‎২৯ জুলাই বাড়িতে পৌঁছালে স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর মধ্যে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিস্থিতি। দীর্ঘদিন পর হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরে পেয়ে অনেকে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

‎কীভাবে ছাড়া পেলেন প্রশ্নের জবাবে আলমগীর দাবি করেন, সরকার পরিবর্তনের পর সম্ভবত অপহরণকারীরা নিজেদের বাঁচাতে ভয় পেয়ে আমাদের ছেড়ে দিয়েছে।

‎এদিকে আলমগীরকে মৃত ভেবে তার পরিবার ও এলাকাবাসী বিভিন্ন সময় মিলাদ, দোয়া মাহফিল এবং মসজিদে দোয়ার আয়োজন করেছিলেন। এমনকি তার স্মরণে কাঙালি ভোজেরও আয়োজন করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী।

‎বিএনপির সাবেক উপজেলা যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান সাহেদ জানান, প্রায় ১৮ বছর তিনি নিখোঁজ ছিলেন। তাকে মৃত ভেবে বিভিন্ন সময় দোয়া মাহফিলের আয়োজনও করা হয়েছে। সম্প্রতি বাড়ি ফিরে আসার খবরে সবাই খুশি হয়েছেন। তিনি দাবি করছেন তাকে আটকে রেখে জোরপূর্বক পরিশ্রমের কাজ করানো হয়েছিল। তিনি ফিরে আসার পর আমরা তাকে পাথরঘাটা হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। চিকিৎসা শেষে তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছি ।