ছাতক বিউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী, শর্ত দিয়ে ঘুষ খান
- আপডেট সময়ঃ ১২:১৭:১৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর ২০২৫
- / ৫৮ বার পড়া হয়েছে।
ছাতক উপজেলার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ এখন যেন দুর্নীতি, অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভয়ারণ্য।
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল মজিদের যোগদানের পর থেকে দপ্তরটি পরিণত হয়েছে এক ‘দুর্নীতির দুর্গে’, যেখানে ন্যায়-নীতির চেয়ে প্রভাব, ভয়ভীতি ও ঘুষই হয়ে উঠেছে কাজের মূল শর্ত- এমন অভিযোগ করেছেন অসংখ্য ভুক্তভোগী গ্রাহক ও স্থানীয়রা।
বিদ্যুৎ সংযোগ, লাইন মেরামত বা বিল সংশোধন প্রতিটি ক্ষেত্রেই দিতে হয় মোটা অঙ্কের ঘুষ। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ না দিলে গ্রাহকদের হয়রানি, দপ্তরে দপ্তরে ঘুরানো, এমনকি মিথ্যা মামলা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। অসংখ্য গ্রাহক জানিয়েছেন, মিটার রিডিং না দেখেই অতিরিক্ত বিল তৈরি করা হচ্ছে এবং পরবর্তীতে সেই বকেয়া বিলের অজুহাতে গ্রাহকদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেওয়া হয়।
ইসলামপুর ইউনিয়নের গনেশপুরের জাহিদ হাসান মোহাম্মদ রুহেল এই অফিসের হয়রানির শিকার হন। গেল ২৬ অক্টোবর তাঁকে আকস্মিকভাবে পুলিশ ধরে নিয়ে যায় বকেয়া বিলের মামলায়, অথচ তার নামে কোনো বকেয়া বিলই ছিল না। তদন্তে দেখা যায়, প্রকৃত বকেয়া বিলধারী অন্যজন (নাজমুল হুদা, মিটার নং ৪৪২৭৩০৭০), যার পাওনা প্রায় দুই লাখ ১৭ হাজার টাকা। ওয়াপদা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও অসৎ উদ্দেশ্যের বলি হয়েছেন নির্দোষ রুহেল। পরবর্তীতে তাঁকে ‘আপোষের’ প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি ন্যায়ের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। গত ৭ নভেম্বর মন্ডলীভোগ এলাকায় ‘মিটার চেক’-এর নামে কিছু বেসরকারি কর্মচারী স্থানীয়দের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও ভাঙচুর চালায়। ভুক্তভোগী আবুল খয়ের থানায় অভিযোগ দায়ের করলে নির্বাহী প্রকৌশলী বিষয়টি ধামাচাপা দিতে উদ্যোগ নেন। সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে তথ্য সংগ্রহে গেলে তাদের ৪০ মিনিট দরজার বাইরে অপেক্ষা করিয়ে পরে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং পুলিশ ডেকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে উল্টো সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেই মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হয়, যা সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্যদের ষড়যন্ত্র বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, ‘লাইন মেরামত’ ও ‘নতুন সংযোগ’ প্রকল্পের বিল উত্তোলনের নামে নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ ও তাঁর ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার চক্র লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। হাসনাবাদ-ইলামেরগাঁও এলাকায় নতুন বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনের নামে দুই লাখ টাকার প্রকল্পে এক লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার ভিডিও ফুটেজ ইতোমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। বাকি টাকা না পাওয়ায় প্রকল্পটি ইচ্ছাকৃতভাবে স্থগিত রাখা হয়। এর আগেও একই ধরণের ঘুষ বাণিজ্যে জড়িত দুই কর্মচারীকে সেনাবাহিনী হাতে-নাতে আটক করেছিল।
সম্প্রতি দক্ষিণ বাগবাড়ি এলাকায় ট্রান্সমিটার পরিবর্তনের নামে তিন লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে ওই সিন্ডিকেট সদস্যদের বিরুদ্ধে। এছাড়া কার্ড মিটার জালিয়াতি, বকেয়া বিলের নাম করে চাঁদাবাজি, লাইনের অদক্ষ মেরামতের কারণে মানুষ ও গবাদি পশুর মৃত্যু এসবই এখন ছাতক বিদ্যুৎ অফিসের নিত্যচিত্র। যে কেউ সিন্ডিকেটের অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, থানায় হয়রানি ও সামাজিক অপমানের আয়োজন করা হয়। সাংবাদিকরাও এর ব্যতিক্রম নন। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিনই ছাতক বিদ্যুৎ অফিসের দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও হয়রানির ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ে ছাতক ওয়াপদার সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মালেককে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল। এখন তাঁর উত্তরসূরি আব্দুল মজিদ একই কায়দায় দপ্তরটিকে আবারও দুর্নীতির জালে আবদ্ধ করেছেন। তথ্য অনুযায়ী, তাকেও পূর্বে বান্দরবানে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল। স্থানীয়দের মতে, ছাতক ওয়াপদা এখন পুরোপুরি সিন্ডিকেটের কব্জায়। ভুক্তভোগী গ্রাহকরা বলছেন, ওয়াপদা অফিসে কাজ করাতে গেলে ঘুষ ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই।সাধারণ মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার বদলে দেওয়া হচ্ছে হয়রানি আর ভয়ভীতি।
ছাতক পৌর শহরের আট নম্বর ওয়ার্ডের চরেরবন্দ গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুস সাত্তার অভিযোগ করে বলেন, প্রায় সাত মাস আগে ছাতক থানা পুলিশ হঠাৎ করে তার ছোট ভাই মো. আবুল খয়েরকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। থানায় যোগাযোগ করে তারা জানতে পারেন, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া সংক্রান্ত একটি মামলায় তার ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আব্দুস সাত্তার জানান, বিষয়টি জানার জন্য ছাতক বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে প্রকৌশলী আব্দুল মজিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তারা। প্রকৌশলী মজিদ তাকে অফিসের স্টাফ জাকিরের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
জাকির তাকে বলেন, অফিসের এক কর্মচারীর ভুলের কারণে অন্য একজনের (দক্ষিণ বাগবাড়ী এলাকার) বাসায় তার ভাইয়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে একটি মিটার সংযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেই মিটারের বকেয়া বিলের দায়েই আবুল খয়েরকে গ্রেপ্তার করা হয়। আব্দুস সাত্তার আরও জানান, বিদ্যুৎ অফিস থেকে বিল পরিশোধের প্রমাণ দেখানোর পর আদালতের মাধ্যমে তার ভাই তিন দিন পর সুনামগঞ্জ কারাগার থেকে মুক্তি পান।
এলাকার কাউন্সিলর মাসুক মিয়া বলেন, ছাতক বিদ্যুৎ অফিসের প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি অবৈধভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন যা গোটা শহওে অনেকটা ‘ওপেন-সিক্রেট’। তিনি আরও জানান, এই অফিসের কর্মচারী আলী হোসেনের বিরুদ্ধে তিনি অনিয়ম দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এলাকাবাসী মানববন্ধনও করেছেন। কিন্তু প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ ও আলী হোসেনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে ছাতক বিউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল মজিদ সাংবাদিকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং কোনো মন্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।
সিলেট বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদির বললেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন আচরণ করা অত্যন্ত অনভিপ্রেত। বিষয়টি বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হবে।
সুত্রঃসুনামগঞ্জেরখবর











