সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে বহিরাগতদের দৌরাত্ম্য, জরুরি বিভাগে চিকিৎসায় হস্তক্ষেপ ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ
- আপডেট সময়ঃ ০২:৪০:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
- / ৬৯ বার পড়া হয়েছে।
হকবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট;
সুনামগঞ্জ ।। ১৫ অক্টোবর ২০২৬
সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে বহিরাগত ও দালাল চক্রের উপদ্রব আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করছে স্থানীয় একদল যুবক। প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসাবিদ্যায় কোনো ন্যূনতম যোগ্যতা বা সনদ না থাকা সত্ত্বেও রোগীদের ইনজেকশন দেওয়া এবং ক্ষতস্থানে সেলাইয়ের মতো জটিল ও সংবেদনশীল কাজে হাত দিচ্ছে তারা। এতে একদিকে যেমন সরকারি এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগীদের জীবনঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে সেবার মান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্থানীয় এই প্রভাবশালী চক্রটির বিরুদ্ধে শুধু চিকিৎসাসেবায় অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপই নয়, বরং রোগীদের স্বজনদের ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় এবং উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ারও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে এসে এ ধরনের হয়রানি ও আর্থিক শোষণের শিকার হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনেরা।
গত ৮ অক্টোবর রাতে সরেজমিনে হাসপাতাল পরিদর্শনে চরম অনিয়মের দৃশ্য চোখে পড়ে। দেখা যায়, মাথায় আঘাত পেয়ে আসা এক বয়স্ক রোগীর ক্ষতস্থানে চেতনানাশক ইনজেকশন দেওয়া থেকে শুরু করে সুঁই-সুতা দিয়ে সেলাই করার কাজটি করছেন সাব্বির নামের এক যুবক। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এ সময় সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও কেউ তাকে বাধা দেননি। অভিযুক্ত সাব্বির নিজেকে হাসপাতালের ‘আউটসোর্সিং কর্মী’ হিসেবে দাবি করলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা নথিপত্রে এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। এমনকি চিকিৎসাসংক্রান্ত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা বা প্রশিক্ষণও তার নেই।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, শহরের পাশে হাসননগর এলাকার বাসিন্দা সাব্বিরের নেতৃত্বে জাহির আলী, মিজান, জমিরুল, রবিন ও রুমনসহ ১০-১২ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিয়মিত হাসপাতালে এ ধরনের অপকর্ম চালিয়ে আসছে। জরুরি বিভাগে প্রভাব খাটিয়ে তারা অননুমোদিতভাবে চিকিৎসাকাজে অংশ নেয় এবং পরবর্তীতে সেবার নামে রোগীদের স্বজনদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ দাবি করে।
হাসপাতালে স্থানীয় চক্রের অবৈধ প্রভাবের বিষয়টি স্বীকার করেছেন সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, “হাসপাতাল প্রশাসন তো রাতে সরাসরি উপস্থিত থাকে না। ওই সময় জরুরি বিভাগে মেডিকেল অফিসার ও নার্সরা সেবা দিয়ে থাকেন। কর্তব্যরতদের অধিকাংশ অন্য জেলার বাসিন্দা হওয়ায় স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি সুযোগ নিয়ে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। আমরা ইতোমধ্যে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনকে অবগত করেছি। হাসপাতালকে যেকোনো মূল্যে বহিরাগত মুক্ত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।”
এদিকে হাসপাতালের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করেছে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত ৯ অক্টোবর রাতে হাসপাতালে অনাধিকার প্রবেশ এবং রোগীদের চিকিৎসায় অবৈধ হস্তক্ষেপের দায়ে জমিরুল ইসলাম নামে চক্রের এক দালালকে হাতেনাতে আটক করে আনসার সদস্যরা।
দালাল ও বহিরাগতদের প্রবেশ রোধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে জেলা আনসার কমান্ডার মোরশেদা খানম বলেন, “হাসপাতালে অরাজকতা সৃষ্টিকারী বহিরাগত ও দালাল চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে। এক্ষেত্রে আনসার ব্যাটালিয়ন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি হাসপাতাল কর্মীদের ড্রেসকোড বা নির্ধারিত পোশাক পরিধানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট অভিন্ন পোশাক ছাড়া অন্য কেউ যদি কোনো রোগীকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আলী আশরাফ সোহাগ জানান, বহিরাগত ও দালালদের উৎপা্যে তারাও চরম বিরক্ত ও বিব্রত।
তিনি বলেন, “হাসপাতালের পরিবেশ সুস্থ রাখতে আমরা জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম মহোদয়েরও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। তিনি সম্প্রতি হাসপাতাল সরেজমিনে পরিদর্শন করে সার্বিক শৃঙ্খলা ফেরাতে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এছাড়া আসল কর্মীদের চিহ্নিত করতে এবং বহিরাগতদের রোধ করতে হাসপাতালের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য খুব দ্রুত অভিন্ন পোশাকের (ইউনিফর্ম) বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।”
সাধারণ মানুষের দাবি, সুনামগঞ্জের প্রধান সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রটিতে অবিলম্বে নিয়মিত প্রশাসনিক নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এসব দালাল ও ভুয়া চিকিৎসা প্রদানকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে সাধারণ মানুষ নিরাপদে কাঙ্ক্ষিত সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারে।



















