আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণাঃ
দুই পুলিশের মৃত্যুদণ্ড, সাবেক ভিসিসহ ৩০ জনের সাজা
- আপডেট সময়ঃ ১০:৫৬:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
- / ৪ বার পড়া হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই তপ্ত দুপুরে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদের সেই ছবি আজও প্রতিটি বাঙালির স্মৃতিতে অম্লান। পুলিশের বুলেটের সামনে অকুতোভয় সেই তরুণের আত্মদানের ঘটনায় অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলো।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আজ ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন। রায়ে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, তিনজনকে যাবজ্জীবন এবং সাবেক ভিসিসহ বাকি আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত রায় ও পর্যবেক্ষণঃ
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আজ সর্বসম্মতিক্রমে এই রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায় ঘোষণার ঐতিহাসিক মুহূর্তটি বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচার করে।
ট্রাইব্যুনাল আবু সাঈদ হত্যার ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এই কঠোর শাস্তির নির্দেশনা দেন।
মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন পেলেন যারাঃ
আবু সাঈদকে সরাসরি গুলি করার দায়ে অভিযুক্ত পুলিশের দুই সদস্যকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন সাবেক এএসআই (সশস্ত্র) মো. আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। এই দুই আসামি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
অন্যদিকে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার দায়ে পলাতক তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন—সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন এবং বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ এসআই (নিরস্ত্র) বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব।
সাবেক ভিসি ও পুলিশ কমিশনারসহ ১০ বছরের কারাদণ্ডঃ
এই মামলায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দায়ও এড়িয়ে যায়নি আদালত। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু এবং রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টুসহ ৫ জনকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বাকিরা হলেন—বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, আসাদুজ্জামান মন্ডল ওরফে আসাদ এবং তৎকালীন বেরোবি ছাত্রলীগ সভাপতি পোমেল বড়ুয়া।
আদালত এই ঘটনায় সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকার অভিযোগে ৫ বছর ও ৩ বছরের কারাদণ্ডও ঘোষণা করেছেন।
৫ বছরের কারাদণ্ডঃ
সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন (টিটু), সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী (সুমন), সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীসহ মোট ৮ জন এই সাজা পেয়েছেন।
৩ বছরের কারাদণ্ডঃ
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার, সেকশন অফিসার এবং ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দসহ মোট ১১ জন আসামিকে ৩ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
এছাড়া, প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেলের ক্ষেত্রে তার হাজতবাসের সময়কেই কারাদণ্ড হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও আইনি লড়াইঃ
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালীন পার্ক মোড়ে পুলিশের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন আবু সাঈদ। তার সেই দুই হাত প্রসারিত সাহসী ভঙ্গিটি ছিল স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যু পরবর্তী সময়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে জনবিস্ফোরণে রূপ দেয়।
গত বছরের ৩০ জুন সাবেক ভিসিসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আমলে নিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। বিচারিক প্রক্রিয়ায় ২৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আজ এই মামলার যবনিকাপাত ঘটল। আজকের রায় ঘোষণার সময় প্রসিকিউশন পক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম ও তার দল। আসামিপক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট আমিনুল গণি টিটো, আজিজুর রহমান দুলু এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী সুজাদ মিয়া।
তথ্যসহায়তাঃবাসস












