মহাকালের চাদরে এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়:
বিদায় নিলেন বর্ষীয়ান রাজপথের কাণ্ডারি তোফায়েল আহমেদ
- আপডেট সময়ঃ ০৯:৩১:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬
- / ৪ বার পড়া হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি, প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮২ বছর বয়সে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত এবং শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগের জটিলতায় ভুগছিলেন।
তাঁর জামাতা ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন গণমাধ্যমকে এই শোকাবহ সংবাদটি নিশ্চিত করেছেন। ভোলার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে যিনি পুরো বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সারথি হয়ে উঠেছিলেন, তাঁর এই মহাপ্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো।
জন্ম, শৈশব ও শিক্ষাজীবন
তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বাকেরগঞ্জ জেলার (বর্তমান ভোলা জেলা) সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মৌলভী আজহার আলী এবং মায়ের নাম ফাতেমা বেগম। ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে সফলতার সাথে ম্যাট্রিক পাস করার পর তিনি বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৬২ সালে আইএসসি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর (এমএসসি) ডিগ্রি লাভ করেন।
ছাত্র রাজনীতি ও উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়েই তোফায়েল আহমেদের ভেতরের আপসহীন নেতৃত্ব বিকশিত হতে শুরু করে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ মেয়াদে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হিসেবে রাজপথ কাঁপানো আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। এই গণআন্দোলনের মুখে তৎকালীন আইয়ুব খান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ১০ লাখ মানুষের বিশাল জনসমুদ্রে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন এই ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ।
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ
১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চমক সৃষ্টি করেছিলেন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধান সংগঠক ও আঞ্চলিক কমান্ডার হিসেবে সম্মুখ সমরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাকেরগঞ্জ-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ এই রাজনৈতিক সহচর তাঁর রাজনৈতিক সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন সামরিক জান্তা সরকার তাঁকে দীর্ঘ সময় কারাবন্দি করে রাখে।
দীর্ঘ সংসদীয় ক্যারিয়ার ও মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব
তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এক অনন্য ও ঈর্ষণীয় রেকর্ড গড়েছেন। তিনি দেশের বিভিন্ন সংসদীয় আসন (ভোলা-১, ভোলা-২ ও বিলুপ্ত বাকেরগঞ্জ-১) থেকে মোট নয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি পুনরায় সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব সামলান। বর্ণাঢ্য এই রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর শীর্ষতম সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
জীবনের শেষ দিনগুলো
রাজনীতিতে দীর্ঘ পথচলার পর জীবনের শেষভাগে এসে তিনি এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ২০২১ সালের জুন মাসে এক আবেগঘন ঘোষণায় তিনি তাঁর উপার্জিত ও পৈত্রিক সমস্ত সম্পত্তি গরিব এবং অসহায় মানুষের কল্যাণে দান করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘদিনের চেনা এই রাজনীতিবিদ অনেকটাই আড়ালে চলে যান। অবশেষে দীর্ঘ রোগভোগের পর এই বরেণ্য জননেতা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তাঁর এই প্রস্থান বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের একটি বর্ণাঢ্য ও গৌরবোজ্জ্বল সোনালী অধ্যায়ের চিরতরে অবসান ঘটাল।










