দুই সপ্তাহের আলটিমেটামেই পতন:
বিএসইসি চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদসহ পুরো কমিশনের একযোগে পদত্যাগ
- আপডেট সময়ঃ ১২:৪৬:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
- / ১৬ বার পড়া হয়েছে।
দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সংস্কারের চরম বার্তা আসার পরপরই পদত্যাগ করেছেন পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। কেবল চেয়ারম্যান একাই নন, সরকারের সেই বার্তার পর তার সঙ্গে থাকা অপর চার কমিশনারও একযোগে পদ ছেড়েছেন। এর ফলে কার্যত অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়েছে দেশের শেয়ারবাজারের শীর্ষ এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
মঙ্গলবার রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক একটি সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সেখানে তিনি দেশের বর্তমান পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এক বড় ঘোষণা দেন। মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বিএসইসি পুরোপুরি পুনর্গঠন করা হবে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই ঘোষণা আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিএসইসির শীর্ষ নেতৃত্বে এই ধস নামে। চেয়ারম্যানের সঙ্গে পদত্যাগ করা কমিশনাররা হলেন— মু: মোহসীন চৌধুরী, মো: আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ এবং মো. সাইফুদ্দিন।
অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও রাজপথের তীব্র আন্দোলন
বিএসইসির এই শীর্ষ পদের পতন এক দিনে বা হঠাৎ করে ঘটেনি। দীর্ঘদিন ধরেই সংস্থাটির ভেতরে ও বাইরে তীব্র অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠেছিল। বিদায়ী চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছিলেন খোদ বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তার পদত্যাগের দাবিতে তারা দীর্ঘদিন ধরে দপ্তরটির ভেতরেই কর্মবিরতিসহ নানা ধরনের প্রতিবাদী আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। এর ফলে ভেতরের দাপ্তরিক কাজ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল।
অন্য দিকে, মাঠ পর্যায়ের সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও ছিলেন তার ওপর চরম ক্ষুব্ধ। বাজারের ধারাবাহিক পতন এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থতার দায়ে রাশেদ মাকসুদের অপসারণ চেয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার রাজপথে আন্দোলন করছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তারা রাজধানী জুড়ে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল এবং সড়ক অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি পালন করেন। ভেতরের কর্মকর্তা এবং বাইরের বিনিয়োগকারীদের এই যৌথ আন্দোলনের মুখে ক্রমাগত কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন চেয়ারম্যান। শেষ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রীর পুনর্গঠনের ঘোষণা সেই ক্ষোভের আগুনে চূড়ান্ত ঘি ঢালে, যার ফলশ্রুতিতে পুরো কমিশন একযোগে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
‘অস্থির সময়ে হাল ধরেছিলাম‘: বিদায়লগ্নে রাশেদ মাকসুদের দাবি
পদত্যাগের আনুষ্ঠানিকতা শেষে খন্দকার রাশেদ মাকসুদ নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে বিএসইসির পক্ষ থেকে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করেন। সেখানে তিনি তার পদত্যাগের প্রেক্ষাপট এবং বিগত দিনগুলোতে নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপের খতিয়ান তুলে ধরে এক প্রকার আত্মপক্ষ সমর্থন করেন।
বিজ্ঞপ্তিতে রাশেদ মাকসুদ উল্লেখ করেন, আজ থেকে প্রায় ২১ মাস আগে দেশের এক অত্যন্ত জটিল ও অস্থির সময়ে তিনি বিএসইসির নেতৃত্বের গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন। বাজার যখন ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল, তখন দায়িত্ব নিয়েই তিনি পুঁজিবাজারের আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একটি ব্যাপক সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করেন।
নিজের সংক্ষিপ্ত মেয়াদের সফলতার খতিয়ান দিতে গিয়ে তিনি বলেন, এই অল্প সময়ের মধ্যেই বিএসইসি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি বিধিমালা গেজেট আকারে চূড়ান্ত প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে। শুধু তাই নয়, বাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে করপোরেট গভর্ন্যান্স, নিরীক্ষা এবং করপোরেট পুনর্গঠন সংক্রান্ত আরও তিনটি অত্যন্ত জরুরি খসড়া বিধিমালা ও নির্দেশিকা তৈরি করে তা জনমতের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন’ এবং ‘ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’—এই দুটি মৌলিক আইনের নতুন খসড়াও সম্পূর্ণ প্রস্তুত করেছিল তার কমিশন।
কঠোর অবস্থান ও স্বাধীন কাজের পরিবেশ তৈরির দাবি
বিদায়ী চেয়ারম্যান আরও দাবি করেন, বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম ও কারসাজি বন্ধ করতে তার কমিশন আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করেছিল। সব ধরনের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক হস্তক্ষেপের সুযোগ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে বাজার মধ্যস্থতাকারী এবং ইস্যুকারীরা কোনো রকম চাপ ছাড়াই নিয়মের মধ্যে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিল। আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বাজারের নিয়মিত অংশীজনদের (স্টেকহোল্ডার) সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রেখে বাজারকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা তিনি করেছিলেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেন।
চার বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই বিদায়
পেছনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ১৮ই আগস্ট চার বছরের এক দীর্ঘ মেয়াদের জন্য বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। তার বোর্ডের অন্য সদস্যদের মধ্যে কমিশনার হিসেবে একই বছরের ২রা জুন মু: মোহসীন চৌধুরী, ২৮শে আগস্ট মো: আলী আকবর এবং ৩রা সেপ্টেম্বর ফারজানা লালারুখ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর সবার শেষে ২০২৫ সালের ২৯শে জুলাই কমিশনার হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন মো. সাইফুদ্দিন।
নিয়ম অনুযায়ী এই কমিশনের আরও বেশ দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের টানা আন্দোলন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতি এবং সবশেষে সরকারের পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীর সরাসরি দুই সপ্তাহের আলটিমেটামের মুখে চার বছরের মেয়াদ পূর্ণ করার অনেক আগেই এই পুরো কমিশনকে বিদায় নিতে হলো। এখন দেখার বিষয়, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সরকার কাদের হাতে তুলে দেয় দেশের পুঁজিবাজারের এই গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার চাবিকাঠি।










