টঙ্গীতে ৪ কোটি টাকার ব্যাংক চেক জালিয়াতিঃ
চাঁদপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক গ্রেফতার
- আপডেট সময়ঃ ০৯:৩১:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
- / ১ বার পড়া হয়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের পেশাদার সতর্কর্তা ও বিচক্ষণতায় নস্যাৎ হয়ে গেল কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটি বড় ধরনের জালিয়াতির চেষ্টা। ভুয়া ও জাল চেকের মাধ্যমে একটি ব্যাংকের করপোরেট অ্যাকাউন্ট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টাকালে হাতেনাতে ধরা পড়েছেন এক যুবদল নেতা।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে গাজীপুরের টঙ্গী কলেজ গেট এলাকায় অবস্থিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর শাখায়।
প্রতারক চক্রটি প্রায় ৪ কোটি টাকা উত্তোলনের উদ্দেশ্যে সুপরিকল্পিত ছক কষেছিল, তবে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার দৃঢ়তায় তা ব্যর্থ হয়। এই জালিয়াতির সাথে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে চাঁদপুর জেলার এক শীর্ষস্থানীয় যুবদল নেতাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত রবিবার দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সদস্যরা টঙ্গী কলেজ গেট এলাকার ইসলামী ব্যাংক শাখায় প্রবেশ করে। তারা অত্যন্ত সুকৌশলে ‘এ আর এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ইস্যু করা ৪ কোটি টাকার একটি চেক কাউন্টারে জমা দেয়।
চেকটি জমা দেওয়ার পরপরই চক্রের সদস্যরা টাকাগুলো নগদ উত্তোলনের পরিবর্তে দ্রুত অন্য একটি অ্যাকাউন্টে অনলাইন স্থানান্তরের (ফান্ড ট্রান্সফার) জন্য ব্যাংক কর্মকর্তাদের ওপর এক প্রকার মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। তাদের আচরণে এমন একটি ভাব ছিল যেন লেনদেনটি অত্যন্ত জরুরি এবং দ্রুত শেষ করতে হবে।
হঠাৎ দুপুরের শেষভাগে এসে এত বড় অঙ্কের টাকা তাড়াহুড়ো করে অন্য অ্যাকাউন্টে সরানোর এই মরিয়া প্রচেষ্টা দেখে খটকা লাগে ব্যাংকের অপারেশন ম্যানেজার বোরহান উদ্দিন আহমেদের।
পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে লেনদেনের প্রক্রিয়াটি সাময়িক স্থগিত রেখে চক্রের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। তিনি এই বিপুল অর্থের উৎস, প্রেরকের পরিচয় এবং লেনদেনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চান।
কিন্তু ব্যাংকের অভিজ্ঞ এই কর্মকর্তার যৌক্তিক প্রশ্নগুলোর কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি চক্রের সদস্যরা। উল্টো তারা অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে শুরু করলে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সন্দেহ আরও তীব্র হয়।
সন্দেহ ঘনীভূত হওয়ায় অপারেশন ম্যানেজার বিষয়টি শাখার প্রধান তথা শাখা ব্যবস্থাপক (ইনচার্জ) সাইদুল ইসলামের নজরে আনেন। শাখা ব্যবস্থাপক অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চেকে উল্লেখিত মূল অ্যাকাউন্টের বিবরণী ব্যাংকিং সফটওয়্যারে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ৪ কোটি টাকার চেকে যে মূল অ্যাকাউন্টটি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি মূলত ইসলামী ব্যাংকের ঢাকার পল্টন শাখার একজন করপোরেট গ্রাহকের।
কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়ে টঙ্গী শাখার ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সরাসরি পল্টন শাখার সেই মূল হিসাবধারী রাশেদুল ইসলাম চৌধুরীর সাথে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগ করে। টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী অত্যন্ত বিস্ময় প্রকাশ করেন।
তিনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, তার প্রতিষ্ঠান থেকে কাউকে ৪ কোটি টাকার কোনো চেক ইস্যু করা হয়নি এবং বর্তমানে চেকে যে স্বাক্ষরটি দৃশ্যমান রয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভুয়া এবং জাল।
ব্যাংকের ভেতরেই আটক ও পুলিশি অ্যাকশনঃ
জালিয়াতির বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার পর ব্যাংক কর্মকর্তারা অত্যন্ত চতুরতার ও ধৈর্যের পরিচয় দেন। তারা প্রতারক চক্রের সদস্যদের বুঝতে না দিয়ে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রমের অজুহাতে ভেতরের একটি কক্ষে বসিয়ে রাখেন। একই সাথে গোপনে টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করা হয়।
খবর পাওয়ার পরপরই টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নির্দেশনায় পুলিশের একটি চৌকস দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ ব্যাংক ঘেরাও করে জালিয়াতি চক্রের মূল হোতা মাসুদ চৌধুরীকে (৪৪) হাতেনাতে গ্রেফতার করে থানা হেফাজতে নিয়ে যায়। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ব্যাংকের বাইরে ও ভেতরে থাকা চক্রের অন্য কয়েকজন সহযোগী কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মেহেদী হাসান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পরপরই পুলিশ দ্রুত অ্যাকশনে যায় এবং আসামিকে গ্রেফতার করে।
পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃত মাসুদ চৌধুরী চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের শুক্কুর আলীর ছেলে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে তিনি মতলব উত্তর উপজেলা যুবদলের বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন।
ওসি আরও জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক মাসুদ চৌধুরী জালিয়াতির উদ্দেশ্যে জাল চেক ব্যবহারের কথা স্বীকার করেছেন। এই সংঘবদ্ধ চক্রের সাথে ব্যাংকের কোনো অসাধু চক্র বা বাইরের অন্য কারা জড়িত রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই চাঞ্চল্যকর কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে টঙ্গী পশ্চিম থানায় একটি নিয়মিত দণ্ডবিধি ও প্রতারণার মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।




















