১০০ টাকা ঘুষে মাত্র ১২০ টাকার গ্যাস! ধুঁকছে সিএনজি স্টেশন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে চালকরা
- আপডেট সময়ঃ ১০:৫৩:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬
- / ৮ বার পড়া হয়েছে।
হকবার্তা ডেস্ক:
০৩ আগস্ট ২০২৬
১০০ টাকা ঘুষে মাত্র ১২০ টাকার গ্যাস!ধুঁকছে সিএনজি স্টেশন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে চালকরা ।
সিএনজি অটোরিকশাচালক নুরুল ইসলাম বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী আনা-নেওয়ার কাজ করেন। সংকটের কারণে দুই-তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস মিলছে না। অফিসেরও তাড়া আছে। বাধ্য হয়ে পাম্পের এক কর্মচারীকে ১০০ টাকা দিয়ে লাইন ভেঙে সামনে যাওয়ার সুযোগ মেলে। এতে সিলিন্ডারে গ্যাস নিতে পেরেছেন মাত্র ১২০ টাকার। নুরুল ইসলাম জানান, অফিসের সময়সূচি মানতে এ ছাড়া উপায় ছিল না।
চলমান গ্যাস সংকটের প্রভাব এভাবেই পড়েছে দেশের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। গত ১৮ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশজুড়ে এ দুর্ভোগ চলছে।
জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার স্টেশনে দেখা দিয়েছে সংকট। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস মিলছে না, আবার কোথাও দিনের দীর্ঘ সময় গ্যাস বিক্রি বন্ধ রাখা হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্য যানবাহনের চালকরা। একই সঙ্গে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে স্টেশন মালিকদের। বেড়েছে গণপরিবহনের ভাড়াও।
রাজধানীর মহাখালী, তেজগাঁও, মিরপুর, খিলক্ষেত, যাত্রাবাড়ী, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, রাত থেকেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি। চাপ কিছুটা বাড়লে কয়েকটি গাড়িতে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। আর চাপ কমে গেলে বিক্রি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অনেক চালক তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চাহিদামতো গ্যাস নিতে পারছেন না।
চট্টগ্রাম নগরেও পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় বন্ধ রয়েছে বেশির ভাগ ফিলিং স্টেশন। যার প্রভাবে সড়কে যানবাহন সংকট দেখা দিয়েছে।
গতকাল রোববার সকাল থেকেই নগরের হালিশহর, কদমতলী, আন্দরকিল্লা, জামালখান, বাকলিয়া, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, অক্সিজেন, মইজ্জারটেকসহ বিভিন্ন এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে দেখা যায় সিএনজিচালিত যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক গ্যাস পাননি। সিএনজি ও গণপরিবহন চলাচল কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কর্মজীবী ও সাধারণ যাত্রীরা।
ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। স্বল্পচাপের কারণে অনেক স্টেশন স্বাভাবিক গ্যাস দিতে পারছে না। এতে পরিবহন খাতের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইসরাত আমিন কাজ করেন একটি বেসরকারি সংস্থায়। বাসা আফতাবনগরে, অফিস মতিঝিলে। ভিড় এড়াতে চলাচল করেন সিএনজি অটোরিকশায়।
তিনি বলেন, এই পথে যেতে সাধারণত ২২০-২৫০ টাকা নেন অটোরিকশা চালকরা। কিন্তু কয়েকদিন ধরে ৩৫০ টাকার নিচে কোনো চালক যেতে চাচ্ছেন না। চালকদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বলছেন, ঠিকমতো গ্যাস পাওয়া যায় না, তাই ভাড়া বাড়াতে হয়েছে।
মহাখালীর জামান সিএনজি ফিলিং স্টেশনের কর্মী ইকবাল হোসেন বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ পাচ্ছি না। স্টেশন খোলা থাকলেও অনেক সময় স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে গ্রাহকরা ক্ষুব্ধ হচ্ছেন এবং বিক্রি কমে গেছে।
মিরপুরের শেওড়াপাড়ার ঢাকা সিএনজি স্টেশনের কর্মী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আগে যে সময়ের মধ্যে একটি গাড়িতে গ্যাস দেওয়া যেত, এখন অনেক বেশি সময় লাগছে। চাপ কম থাকায় লাইন দীর্ঘ হচ্ছে।
অটোরিকশাচালক শাহীন মিয়া বলেন, দিনের অর্ধেক সময় এখন গ্যাসের লাইনে কাটে। আগে যতগুলো ট্রিপ দিতে পারতাম, এখন তার অর্ধেকও দিতে পারছি না। আয় অনেক কমে গেছে। আর মালিকের দৈনিক পাওনা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়েই বেশি ভাড়া নিতে হচ্ছে।
শনিবার রাত ১২টার দিকে সাতরাস্তার মোড়ের সিএনজি স্টেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িচালক বিপ্লব সরকার বলেন, সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এমনিতেই পাম্প বন্ধ থাকে (সরকারি নির্দেশনা)। সংকটের কারণে রাত ৮টায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখন ১২টা ১০ বাজে, তাও গ্যাস মেলেনি।
সরেজমিন দেখা যায়, সে সময় এই পাম্পের অপেক্ষমাণ গাড়ির সারি সাতরাস্তা পেরিয়ে কারওয়ান বাজার রেললাইনের দিকে চলে গেছে। গতকাল দুপুরে মগবাজার মোড়ের পাম্পের লাইন অফিসার্স ক্লাব পর্যন্ত বাড়তে দেখা যায়। পাম্পের এই দীর্ঘ লাইন সড়কে যানজট সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর সমকালকে বলেন, গ্যাস সংকট এখন শুধু ঢাকার নয়, সারা দেশেই এর প্রভাব পড়েছে।
বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন স্বল্পচাপের অভিযোগ আসছে। অনেক জায়গায় স্টেশনগুলো মাত্র ২ থেকে ৩ পিএসআই চাপ পাচ্ছে। এই চাপে কোনোভাবেই স্বাভাবিক গ্যাস দেওয়া সম্ভব নয়। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে স্টেশন মালিকদের আর্থিক ক্ষতি আরও বাড়বে, পাশাপাশি চালক ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হবে।
মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগার পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।
দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে ৯০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়।
একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় সরবরাহ কমেছে প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে ২১৫ কোটি ঘনফুটে। এতে চাহিদার চেয়ে গ্যাস ঘাটতি আরও বেড়েছে।
জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনমান্দ মান্নান সমকালকে বলেন, প্রকৌশলীরা দিন-রাত কাজ করছেন এফএসআরইউ মেরামতে। প্রয়োজনীয় ও বিশেষভাবে প্রস্তুত যন্ত্রপাতি হাতে এসেছে। দু-এক দিনের মধ্যে টার্মিনালটি আবার চালু হতে পারে ।
















