রংপুরে নিজ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা দম্পতিকে কুপিয়ে খুন
- আপডেট সময়ঃ ১০:৪৮:৩০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ৭৩ বার পড়া হয়েছে।
রংপুরের তারাগঞ্জে নিজ বাড়িতে স্ত্রীসহ মুক্তিযোদ্ধাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ডাবল মার্ডারের ঘটনায় রংপুর জুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
বিজয়ের মাসে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে নিজ বাড়িতে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। কেন খুন হলো, কারা খুন করলো, রহস্যটাই বা কি এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষজনের মাঝে।
এলাকাবাসীসহ সর্বমহলের তরফ থেকে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তসহ খুনিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি উঠেছে। এদিকে পুলিশ এই জোড়া খুনের রহস্য উদ্ঘাটনসহ হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে।
অপরদিকে রংপুর-২ আসনে জামায়াত ও বিএনপি প্রার্থী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। থানা পুলিশের পাশাপাশি পিবিআই তদন্তে মাঠে নেমেছে।
ফাঁকা বাড়িতে হত্যা: উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের খিয়ারপাড়া গ্রামে নিজ বাড়িতে বসবাস করতেন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় (৮০) ও স্ত্রী সুবর্ণা রায় (৬৫)। তাদের দুই ছেলে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে চাকরিরত রয়েছে। তাই বাড়িতে দুই স্বামী-স্ত্রী বসবাস করতেন। নিজেদের জমিতে চাষাবাদ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। তাদের দৈনন্দিন কাজে সহযোগিতা করতেন প্রতিবেশী কৃষি শ্রমিক দীপক চন্দ্র। যোগেশ চন্দ্রের বাড়িতে রোববার সকালে প্রতিদিনের মতো কাজ করতে আসেন দীপক। কিন্তু সকালে এসে বাড়ির দরজা বন্ধ পান। এরপর বাড়ির পেছনে জানালা দিয়ে অনেক ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে কেউ আওয়াজ দেয়নি।
এ সময় প্রতিবেশীরা দীপককে বাড়ির ভেতরে প্রবেশের কথা বলে। প্রতিবেশীর একটি মই ব্যবহার করে দীপক বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে শয়ন কক্ষের দরজা খুলে দেখেন মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় যোগেশ চন্দ্রের নিথর দেহ পড়ে রয়েছে। এ সময় তিনি চিৎকার দিলে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়। পরে রান্নাঘরে রক্তাক্ত অবস্থায় সুবর্ণা রায়ের মরদেহ দেখতে পান প্রতিবেশীরা।
দীপক চন্দ্র বলেন, প্রতিদিন অনেক সকালে দাদু যোগেশ ও দাদি সুবর্ণা ঘুম থেকে উঠেন এবং গৃহস্থালীর কাজ করেন। কিন্তু আজ সকালে বেলা হলেও তাদের কাউকে বাড়ির বাহিরে দেখা যায়নি। এ নিয়ে খটকা লাগলে দেয়াল টপকে বাড়ির ভেতরে গিয়ে দেখি দু’জনের লাশ পড়ে আছে। দাদির মাথায় চোট দেখেছি। দুই ঘরের মেঝেতেই রক্ত দিয়ে ভরা।
যা বলছেন স্বজনরা: নিহত যোগেশের ছেলে রাজেশ খান্না বলেন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব আছে বলে মনে আমি করি না। গতকাল রাত ৯টা ২০ মিনিটে বাবার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে আমার। তারা ভাত খাচ্ছিলেন বলে আমাকে জানায়। এরপর আর তাদের সঙ্গে কথা হয়নি। পরে সকালে থানা পুলিশ জানিয়েছে আমার বাবা-মাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমার বাবা মন্দির-শ্মশানের জন্য জমি দিয়েছিলেন। এলাকায় তার সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল না। এরপরেও বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে। আমার বাবা-মা কি দোষ করেছিল যে তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে? আমি হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. আলী হোসেন বলেন, বিজয়ের মাসে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে তার নিজ বাড়িতে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনা জাতির জন্য লজ্জাজনক। রাষ্ট্র আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। আমি প্রধান উপদেষ্টা, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের মহাসচিবসহ প্রশাসনের কাছে দাবি জানাবো ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে হবে। না হলে বীর মুক্তিযোদ্ধারা রাজপথে আন্দোলন করবে।
বিচারের দাবি রাজনৈতিক নেতাদের: জোড়া খুনের ঘটনায় যোগেশ চন্দ্রের বাড়িতে গিয়ে শোকার্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। দুপুরে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও রংপুর-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী এটিএম আজহারুল ইসলাম এবং বিএনপি’র প্রার্থী মোহাম্মদ আলী সরকার যোগেশ চন্দ্রের বাড়িতে যান এবং হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, আমার নির্বাচনী প্রচারণা কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে রাস্তায় শুনতে পাই এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা। আমি ক্ষুব্ধ, ব্যথিত ও দুঃখিত। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। তারাগঞ্জসহ সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমরা পুলিশের কাছে অনুরোধ ও দাবি করছি তারা যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন ও দায়ীদের গ্রেপ্তার করে।
বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আলী সরকার বলেন, যোগেশ চন্দ্র শিক্ষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি মানুষ হিসেবে ভালো ছিলেন। তার মতো নিরীহ মানুষকে কেন হত্যা করা হলো তা পুলিশকে দ্রুত উদ্ঘাটন করতে হবে। এমন জোড়া খুনের ঘটনা আমার সংসদীয় আসনে এর পূর্বে ঘটেনি।
তথ্যসহায়তাঃমানবজমিন











