নতুন করে যুদ্ধের উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে, সৌদি আরবের সঙ্গে মুখোমুখি আরব আমিরাত
- আপডেট সময়ঃ ০৬:০০:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৪০ বার পড়া হয়েছে।
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে রাজনীতির নাটকীয় পটপরিবর্তনে অপ্রত্যাশিতভাবে মুখোমুখি অবস্থানে চলে এসেছে দুই প্রভাবশালী উপসাগরীয় শক্তি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
সৌদির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে রিয়াদে ‘সংলাপে’ অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রভাবশালী দেশ এবং মিত্র সৌদি আরব ও আরব আমিরাত গৃহযুদ্ধের মধ্যে ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে হস্তক্ষেপ করে আসছিল। কিন্তু এ জোটে ভাঙন ধরেছে। তারা এখন ইয়েমেনে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এগুলোর একটি গোষ্ঠী দেশটির দক্ষিণাঞ্চলকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণার চেষ্টা চালাচ্ছে।
গত শুক্রবার সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত ওই গোষ্ঠী (এসটিসি) ইয়েমেনের দক্ষিণে নতুন করে ‘যুদ্ধ’ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সেখানে সৌদি আরব-সমর্থিত একটি স্থলবাহিনী হামলা চালিয়েছে। তাদের সমর্থনে সৌদি আরবের বিমানবাহিনীও হামলা করেছে।
এ পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে সক্রিয় সব গোষ্ঠীকে রিয়াদে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, রিয়াদে একটি বড় পরিসরে সম্মেলন আয়োজন করা হোক; যাতে ইয়েমেনের দক্ষিণের সব গোষ্ঠী একত্র হয়ে উদ্ভূত সমস্যার ন্যায়সংগত সমাধান নিয়ে আলোচনা করতে পারে।
ইয়েমেন সরকারের পক্ষ থেকেই আলোচনার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলেও জানায় রিয়াদ।
ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় ২০১৪ সালে। এর আগে থেকেই প্রাণঘাতী সংঘাত দারিদ্র্যপীড়িত দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ খাদ্যসংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
গৃহযুদ্ধের শুরুতে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা দ্রুতগতিতে রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের উত্তরের বেশির ভাগ অংশের দখল নেয়। সংঘাত তীব্র হয় ২০১৫ সালে। তখন সৌদি আরব, আমিরাতসহ আরব দেশগুলোর একটি জোট ইয়েমেন সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে সেখানে সামরিক অভিযান শুরু করে।
তবে হুতিদের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতির পর কয়েক বছর ধরে ইয়েমেনে সংঘাত ও লড়াই অনেকটা কমে এসেছে। ২০২২ সালে সৌদি আরবের সমর্থনে ইয়েমেনে প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (পিএলসি) গঠিত হয়। হুতিবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একত্র করতে এ কাউন্সিল গঠন করা হয়েছিল, যা এখন ভাঙনের পথে।
এদিকে, ২০২২ সালের পর দক্ষিণ ইয়েমেনের বৃহৎ অংশ আমিরাত-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) দখলে চলে গেছে। এসটিসিও আনুষ্ঠানিকভাবে পিএলসি জোটের অংশ। কিন্তু গত ২ ডিসেম্বর থেকে জোটের ভেতর সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে।
এসটিসি এখন দক্ষিণে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ লক্ষ্যে তারা দেশের পূর্বাংশে একটি বড় সামরিক অভিযান চালিয়েছে এবং দ্রুতই সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চল দখলে নিয়েছে।
এসটিসি ইয়েমেনের তেলসমৃদ্ধ হাজরামাউত প্রদেশও দখল করেছে। প্রদেশটি সৌদি আরব সীমান্তে অবস্থিত। এসটিসির দাবি, দক্ষিণে ‘স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ জন্য এ অভিযানের প্রয়োজন ছিল।
যদিও পিএলসির প্রধান রাশাদ আল-আলিমি এসটিসির অভিযানকে ‘বিদ্রোহ’ বলে বর্ণনা করে এর নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে এসটিসির এ চেষ্টা ইয়েমেনকে টুকরা টুকরা করে ফেলতে এবং এ অঞ্চলকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এসটিসির সামরিক অভিযানের পাল্টা জবাব দিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় ওই অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। শুক্রবার হাজরামাউতে এসটিসির একটি সামরিক শিবিরে এ জোটের বিমান হামলায় সাতজন নিহত হয়েছেন।
এর আগে গত মঙ্গলবার দক্ষিণের মুকাল্লা বন্দরে বিমান হামলা চালায় এ জোট। তখন জোটের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়, আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য সামরিক সরঞ্জামভর্তি দুটি জাহাজ পাঠানো হয়েছে।
হামলায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগুনে পোড়া যানবাহনের ছবি দেখা গেছে।
আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, জাহাজে কোনো অস্ত্র ছিল না এবং ওই যানবাহনগুলো ইয়েমেনে অবস্থিত আমিরাতি বাহিনীর ব্যবহারের জন্য পাঠানো হয়েছিল।
মঙ্গলবারের হামলার পর ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল কাউন্সিলের প্রধান বলেন, তাঁরা আমিরাতের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল করেছেন এবং তাঁদের বাহিনীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন।
সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমিরাতের বাহিনীকে ইয়েমেন ছেড়ে চলে যাওয়ার এ নির্দেশে সমর্থন জানিয়েছে। সৌদির অভিযোগ, আরব আমিরাত এসটিসিকে পূর্বাঞ্চলে অভিযান চালাতে চাপ দিচ্ছে। এসটিসি এরই মধ্যে সৌদি আরব সীমান্তে পৌঁছে গেছে। মন্ত্রণালয় সতর্ক করে আরও বলেছে, এটা সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
এসটিসির সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের পেছনে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে আরব আমিরাত। কিন্তু অভিযোগ অস্বীকারের কয়েক ঘণ্টা পরই তারা ইয়েমেন থেকে নিজেদের বাহিনী প্রত্যাহারে সম্মতি দেয়। অনেকের কাছেই আমিরাতের এ সিদ্ধান্ত অপ্রত্যাশিত ছিল।
চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারিয়া আল-মুসলিমি মনে করেন, যদি সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেন থেকে তাদের বাহিনীকে পুরোপুরি প্রত্যাহার করেও নেয়, তাতে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না। কারণ, এটা তাদের সমর্থিত এসটিসি বাহিনীর পিছু হটার ইঙ্গিত দেয় না।
ফারিয়া আরও বলেন, ‘আরব আমিরাত ২০১৯ সালের পর ইয়েমেনে উল্লেখ করার মতো সেনা উপস্থিতি রাখেনি। তারা (আমিরাত) বিশেষ বাহিনী এবং মূলত মাঠে সরাসরি কাজ করা নিজেদের প্রক্সি নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল।’
এদিকে ইয়েমেনের দক্ষিণাংশে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধিকে দুই উপসাগরীয় শক্তির মধ্যে উদীয়মান প্রক্সি যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। যদিও ইয়েমেনের রাজনীতির ওপর ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখা পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, বাইরের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টা এমন মনে হলেও আদতে এসটিসির সাম্প্রতিক অগ্রগতি দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশিত ছিল।
ইয়েমেন-বিষয়ক সাংবাদিক আনোয়ার আল-আনসি বিবিসি আরবিকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের দক্ষিণের প্রায় পুরোটায় নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের পর এসটিসির প্রত্যাশা আরও বেড়েছে।
গবেষক মুসলিমি বলেন, ‘ইয়েমেনের ভেতর এসটিসির কর্মকর্তা আল-জুবাইদি সবচেয়ে ধারাবাহিকভাবে দক্ষিণ ইয়েমেনে স্বাধীনতার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাই, আমার মনে হয় না, তিনি সহজে হাল ছাড়বেন।’
এসটিসির মুখপাত্র আনোয়ার আল-তামিমিও বিবিসিকে নিজেদের আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘অনেক বছর ধরেই আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট এবং তা হলো একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। আমরা কাউকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করিনি। দক্ষিণের মানুষের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ করার অধিকার রয়েছে। তবে দুঃখজনকভাবে এ অঞ্চলের অনেকেই আমাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন।’
এসটিসির স্বাধীনতার এ আকাঙ্ক্ষা সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে ওঠার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আল-তামিমি। তিনি বলেন, ‘আমরা স্থিতিশীলতা বজায় রাখব এবং তাদের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে এমন সন্ত্রাসের উৎস হব না।’
এসটিসির এ আশ্বাস সৌদি-সমর্থিত বাহিনীকে (হুতিবিরোধী জোট পিএলসি) দক্ষিণ ইয়েমেনে আবারও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থেকে বিরত রাখতে যথেষ্ট হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
‘ইয়েমেন প্রশ্নে আরব আমিরাত ও সৌদি আরব কখনোই একমত হতে পারে না, ভবিষ্যতেও পারবে না। মাঠপর্যায়ে তাদের চিন্তাধারা একেবারেই আলাদা। সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনের প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার সীমান্ত। কিন্তু আমিরাতের সঙ্গে ইয়েমেনের কোনো সীমান্তই নেই’, বলেন মুসলিমি।
‘ভাবুন তো, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স যদি সরাসরি একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে—আমি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সম্পর্ককে ঠিক সেভাবেই দেখি। তারা দুটিই ধনী ও শক্তিশালী দেশ, বিপুল অস্ত্র তাদের হাতে আছে। পুরো অঞ্চলের জন্যই এটি খুব খারাপ।’
এসটিসির সাম্প্রতিক কার্যক্রম এবং তাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ইয়েমেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এই সংঘাতের সমাধান সহজ হবে না, কারণ এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব।
ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ এই সংঘাতের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। খাদ্য সংকট, নিরাপত্তাহীনতা এবং মানবিক সহায়তার অভাব তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই সংকট মোকাবিলায় সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখলেও, স্থায়ী সমাধান না আসা পর্যন্ত তাদের দুর্ভোগ কমবে না।
এদিকে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে উদ্ভূত এই উত্তেজনা উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে উভয় দেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়ানো উচিত। আন্তর্জাতিক মহলও এই সংকট নিরসনে মধ্যস্থতা করতে পারে, যাতে ইয়েমেনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।
তথ্যসহায়তাঃপ্রথমআলো











