বিশ্ব রাজনীতি ও জ্বালানি বাজারে নতুন সমীকরণঃ
ওপেক ও ওপেক প্লাস থেকে আমিরাতের ঐতিহাসিক প্রস্থানঃ
- আপডেট সময়ঃ ০৭:২৯:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
- / ২৫ বার পড়া হয়েছে।
২০২৬ সালের ২৮শে এপ্রিল আন্তর্জাতিক জ্বালানি কূটনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) আনুষ্ঠানিকভাবে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক এবং এর বর্ধিত জোট ওপেক প্লাস থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতির এই ক্রান্তিলগ্নে আমিরাতের এমন সিদ্ধান্ত জোটটির শক্তিশালী কাঠামোর ওপর এক চরম আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আমিরাতের এই কঠোর সিদ্ধান্তের মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অসন্তোষ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার অভাব। আমিরাত সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, চলমান ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তারা যখন বারবার আক্রমণের শিকার হচ্ছিল, তখন তাদের আরব ও উপসাগরীয় মিত্র রাষ্ট্রগুলো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে আমিরাত প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশের বক্তব্যে এই ক্ষোভ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তিনি উল্লেখ করেন যে, জিসিসিভুক্ত দেশগুলো লজিস্টিক সহায়তা দিলেও রাজনৈতিক ও সামরিক ময়দানে তাদের অবস্থান ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল। মিত্রদের এই নিষ্ক্রিয়তা আমিরাতকে তাদের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক জোট ত্যাগের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈশ্বিক রাজনীতির চাপও এখানে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ওপেকের বিরুদ্ধে তেলের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখার অভিযোগ করে আসছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে সামরিক সুরক্ষা প্রদান করে, তবে বিনিময়ে তেলের দাম কমিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে হবে।
আমিরাতের এই জোট ত্যাগের সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরালো করার এবং ওয়াশিংটনের চাওয়া অনুযায়ী তেলের বাজারে স্বাধীনভাবে ভূমিকা রাখার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে। যুদ্ধের ডামাডোলে এই পথ ব্যবহার করে রপ্তানি চালিয়ে যাওয়া যখন দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে, তখন ওপেক প্লাসের কঠোর উৎপাদন কোটা মেনে চলা আমিরাতের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লোকসানজনক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
জোট থেকে বেরিয়ে আসার মাধ্যমে এখন আমিরাত নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়াতে বা কমাতে পারবে, যা তাদের জাতীয় অর্থনীতিকে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাঁচাতে সাহায্য করবে।
ওপেক এবং ওপেক প্লাসের জন্য এটি অস্তিত্ব রক্ষার সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৌদি আরবের পর এই জোটের অন্যতম স্তম্ভ ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইতিপূর্বে কাতার এবং অ্যাঙ্গোলা জোট ত্যাগ করলেও আমিরাতের মতো বৃহৎ ও প্রভাবশালী উৎপাদকের প্রস্থান জোটের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং তেলের বাজারে তাদের নিয়ন্ত্রণকে শিথিল করে দেবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর ফলে তেলের বাজারে দীর্ঘদিনের যে ‘কার্টেল’ বা একাধিপত্য ছিল, তা ভেঙে পড়তে পারে এবং ভবিষ্যতে তেলের দাম নির্ধারণে একক কোনো জোটের বদলে বাজার পরিস্থিতি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।
আমিরাতের এই পদক্ষেপ কেবল একটি জ্বালানি নীতি পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পুরনো মিত্রদের মধ্যকার ফাটল যেমন প্রকাশ্যে এলো, তেমনি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ওপেকের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবও এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।
তথ্যসহায়তাঃআল-জাজিরা


















