নিজের তৈরি কবরেই চিরঘুমে বাউল জবান আলী, জানাজা শেষে মরমী সাধককে শেষ বিদায়
- আপডেট সময়ঃ ১০:০৭:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬
- / ২ বার পড়া হয়েছে।
সুর আর বাণীর মায়াজালে লাখো হৃদয় জয় করা প্রবীণ পল্লী বাউল জবান আলী আর নেই। “প্রেমের মানুষ ঘুমাইলেও চাইয়া থাকে”— এই কালজয়ী গানের স্রষ্টা গত মঙ্গলবার (২৬ মে) সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে ৯১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
বর্ণিল সুরের ভুবন ফেলে যাওয়া এই গুণী শিল্পী শেষ জীবনে নানাবিধ জটিল রোগে ভুগছিলেন। প্রয়াণকালে তিনি ৪ ছেলে ও ৫ মেয়েসহ অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী রেখে গেছেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, বাউল জবান আলী দীর্ঘদিন ধরে কণ্ঠনালির ক্যানসার, লিভারের সমস্যা ও বার্ধক্যজনিত শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। যে দরাজ কণ্ঠে তিনি বাউল আসর মাতিয়ে রাখতেন, ভোকালকর্ডের গুরুতর জটিলতায় গত ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তা স্তব্ধ হয়ে যায়; হারিয়ে ফেলেন কথা বলার শক্তি।
গত ১৬ মে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তির পর, ১৮ মে থেকে মেডিকেল রোড এলাকায় এক চাচাতো বোনের বাসায় চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তিনি মারা যান।
আজ বুধবার (২৭ মে) যোহরের নামাজের পর সুনামগঞ্জ পৌর শহরের হাছননগর ঈদগাহ মাঠে মরহুমের নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। জানাজায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সর্বস্তরের ভক্ত-জনতা অংশ নেন। এরপর তাঁকে তাঁর নিজেরই পূর্ব-পরিকল্পিত স্থান—পাঠানবাড়ি উত্তরপাড়ার নিজস্ব কবরে দাফন করা হয়।
মৃত্যুর পর যেন স্মৃতি হারিয়ে না যায়, সেই ভাবনা থেকে এক যুগ আগে (১২ বছর পূর্বে) ১০ শতক জায়গা কিনে নিজের কবর নিজেই পাকা করে রেখেছিলেন জবান আলী। কবরের পাশে একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য জায়গাও রেখে গেছেন তিনি।
মরমী সাধকের নাতি তারেক রহমান বলেন, আমরা নানার স্বপ্ন ও অসমাপ্ত কাজগুলো বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবো, তবে কতৃপক্ষের উচিত, উনার লিখা গানগুলো যথাযথ সংরক্ষণ করা।
এই মরমী সাধকের জীবন কেটেছে চরম বৈরাগ্য ও সাদামাটাভাবে। সুনামগঞ্জ শহরের হাছননগরের একটি জরাজীর্ণ দুই কক্ষের টিনের ঘরেই জীবনের সিংহভাগ সময় পার করেছেন। মূলত দাদা বাউল আব্দুল গণি ও বাবা বাউল আব্দুল মতলিবের হাত ধরে গানের ভুবনে আসা এই শিল্পীর জাগতিক কোনো মোহ ছিল না।
জীবনদশায় তিনি ৭০০-এর বেশি গান রচনা করেছেন, যেখানে আধ্যাত্মিকতা, প্রেম-বিরহ ও সমাজের নানা অসঙ্গতি ফুটে উঠেছে। তাঁর কালজয়ী গানগুলোতে কণ্ঠ দিয়েছেন কুমার বিশ্বজিৎ, অলক বাপ্পা, কাজী শুভ, খায়রুল ওয়াসীসহ দেশের জনপ্রিয় শিল্পীরা।
এছাড়া চলচ্চিত্রে বেবি নাজনীন ও মনির খানের কণ্ঠেও তাঁর গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তবে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তাঁর এই বিশাল সৃষ্টির মাত্র ১০০টি গান দুটি বইয়ে প্রকাশ হতে পেরেছে, বাকিগুলো এখনও পাণ্ডুলিপি আকারে পড়ে রয়েছে। অবশ্য গত বছর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রকাশিত ‘অমাবস্যার কালে’ সংকলনে তাঁর অপ্রকাশিত ৩৫টি গান স্থান পেয়েছিল।
সুরের যে মহাসমুদ্র তিনি রেখে গেছেন, তার তীরে ভক্তদের কাঁদিয়ে বিদায় নিলেন এই গুণী লোকসংগীত শিল্পী। তবে সৃষ্টির মাঝে তিনি বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে।




















