০৭:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাউন্টডাউন শুরু

পরমাণু শক্তির অভিজাত ক্লাবে বাংলাদেশ: রূপপুরে জ্বালানি লোডিং শুরু

হক বার্তা ডেস্ক রিপোর্টঃ
  • আপডেট সময়ঃ ০৬:০২:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১৯ বার পড়া হয়েছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে আজ যুক্ত হলো এক সোনালী অধ্যায়। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করেছে দেশ। 

মঙ্গলবার দুপুর ৩টার দিকে পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরঘেঁষা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে।

‎বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এই ঐতিহাসিক কার্যক্রমের সূচনা করেন। এর মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারকারী ৩৩তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নাম খোদাই হলো।

 

‎উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানানো হয়, জ্বালানি লোডিংয়ের এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং কারিগরি। এটি সম্পন্ন হওয়ার পর শুরু হবে বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ধাপে ধাপে সব কারিগরি পরীক্ষা শেষে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে বাণিজ্যিকভাবে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে।

‘নিরাপত্তাই প্রথম শর্ত’- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী

‎উদ্বোধন শেষে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, “রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল দুটি—নির্ভুল প্রযুক্তি এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) গাইডলাইন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনেই প্রতিটি কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, এই মেগা প্রকল্পটি কেবল বিদ্যুৎ দেবে না, বরং ঢাকা ও মস্কোর মধ্যে বিদ্যমান ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে।

‎রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ এই বিশেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের পাশে থেকে তার দেশের পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমরা এখানে বিশ্বের সর্বাধুনিক ‘থ্রি প্লাস’ জেনারেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছি, যা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে ভবিষ্যতে কেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণেও রোসাটম বাংলাদেশের পাশে থাকবে।”

‎অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি বাংলাদেশের এই অর্জনকে স্বাগত জানান।

অন্যদিকে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, রূপপুর প্রকল্প বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য প্রযুক্তির এক বিশাল দুয়ার খুলে দিয়েছে। এটি কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।

‎এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম আসার প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। গত বছরের ২৮শে সেপ্টেম্বর রাশিয়া থেকে বিশেষ বিমানে করে প্রথম চালানটি ঢাকায় পৌঁছায়। পরবর্তীতে আরও কয়েকটি চালানে মোট ১৬৪টি জ্বালানি বান্ডিল বাংলাদেশে আসে। অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে এসব ইউরেনিয়াম রূপপুরে নিয়ে যাওয়া হয়।

উল্লেখ্য, প্রতিটি বান্ডিলে রয়েছে ৩১২টি করে জ্বালানি রড।

‎এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমাতেও বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আকাশছোঁয়া স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া রূপপুর এখন আর কল্পনা নয়, বরং বাংলাদেশের সক্ষমতার এক দৃশ্যমান বাস্তবতা।

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাউন্টডাউন শুরু

পরমাণু শক্তির অভিজাত ক্লাবে বাংলাদেশ: রূপপুরে জ্বালানি লোডিং শুরু

আপডেট সময়ঃ ০৬:০২:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে আজ যুক্ত হলো এক সোনালী অধ্যায়। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করেছে দেশ। 

মঙ্গলবার দুপুর ৩টার দিকে পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরঘেঁষা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে।

‎বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এই ঐতিহাসিক কার্যক্রমের সূচনা করেন। এর মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারকারী ৩৩তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নাম খোদাই হলো।

 

‎উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানানো হয়, জ্বালানি লোডিংয়ের এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং কারিগরি। এটি সম্পন্ন হওয়ার পর শুরু হবে বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ধাপে ধাপে সব কারিগরি পরীক্ষা শেষে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে বাণিজ্যিকভাবে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে।

‘নিরাপত্তাই প্রথম শর্ত’- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী

‎উদ্বোধন শেষে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, “রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল দুটি—নির্ভুল প্রযুক্তি এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) গাইডলাইন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনেই প্রতিটি কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, এই মেগা প্রকল্পটি কেবল বিদ্যুৎ দেবে না, বরং ঢাকা ও মস্কোর মধ্যে বিদ্যমান ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে।

‎রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ এই বিশেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের পাশে থেকে তার দেশের পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমরা এখানে বিশ্বের সর্বাধুনিক ‘থ্রি প্লাস’ জেনারেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছি, যা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে ভবিষ্যতে কেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণেও রোসাটম বাংলাদেশের পাশে থাকবে।”

‎অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি বাংলাদেশের এই অর্জনকে স্বাগত জানান।

অন্যদিকে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, রূপপুর প্রকল্প বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য প্রযুক্তির এক বিশাল দুয়ার খুলে দিয়েছে। এটি কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।

‎এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম আসার প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। গত বছরের ২৮শে সেপ্টেম্বর রাশিয়া থেকে বিশেষ বিমানে করে প্রথম চালানটি ঢাকায় পৌঁছায়। পরবর্তীতে আরও কয়েকটি চালানে মোট ১৬৪টি জ্বালানি বান্ডিল বাংলাদেশে আসে। অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে এসব ইউরেনিয়াম রূপপুরে নিয়ে যাওয়া হয়।

উল্লেখ্য, প্রতিটি বান্ডিলে রয়েছে ৩১২টি করে জ্বালানি রড।

‎এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমাতেও বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আকাশছোঁয়া স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া রূপপুর এখন আর কল্পনা নয়, বরং বাংলাদেশের সক্ষমতার এক দৃশ্যমান বাস্তবতা।