১০:৪৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

মা-মেয়েকে হত্যা করার পর, ঘাতক স্কুল ড্রেস পরে পালিয়ে যায়

হক বার্তা ডেস্ক রিপোর্টঃ
  • আপডেট সময়ঃ ০৭:২৭:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ১০২ বার পড়া হয়েছে।

‎রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডের একটি বাসায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতেন এম জেড আজিজুল ইসলাম। চারদিন আগে আয়েশা নামের এক নারী গৃহকর্মী হিসেবে কাজে যোগদান করে। গতকাল সকালে আজিজুলের স্ত্রী মালাইলা আফরোজ (৪৮) ও তার মেয়ে নাফিসা বিনতে আজিজ (১৫)কে ছুরি দিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায় গৃহকর্মী আয়েশা। 

‎পালিয়ে যাওয়ার আগে ঘাতক আয়েশা বাথরুমে গোসল করে নিহত নাফিসার স্কুল ড্রেস পরে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে পালায়। 

‎শাহজাহান রোডের ৩২/২/এ বাসার সপ্তম তলার ৭/বি ফ্ল্যাটে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মালাইলা আফরোজ পেশায় গৃহিণী ও নাফিসা মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তবে কি কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে জানা যায়নি এবং ঘাতক আয়েশাকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

‎নিহত নাফিসার বাবা উত্তরার সানবিমস স্কুলের পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক আজিজুল ইসলাম বলেন, বাসায় একজন কাজের মহিলা দরকার ছিল। সাধারণত গেটে অনেকে কাজের সন্ধানে আসেন। চারদিন আগে একটি মেয়ে আসে। বোরকা পরিহিত মেয়েটি বাসার দারোয়ান খালেকের কাছে কাজের সন্ধান করলে সে আমাদের বাসায় পাঠিয়ে দেয়। এরপর আমার স্ত্রী মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে কাজে রেখে দেয়।

‎পরে স্ত্রীর মুখে শুনেছি, মেয়েটার নাম আয়েশা। বয়স আনুমানিক ২০ বছর। তার গ্রামের বাড়ি রংপুর। জেনেভা ক্যাম্পে চাচা-চাচির সঙ্গে থাকে। বাবা-মা আগুনে পুড়ে মারা গেছে। তার শরীরেও আগুনে পোড়ার ক্ষত রয়েছে। তিনি বলেন, মেয়েটা কাজ শুরুর পর প্রথম দু’দিন সময়মতো এসেছে। গতকাল সে সাড়ে ৯টার দিকে আসে। আজ কী হয়েছে, এটা তো আর বলার অবস্থায় নেই।

‎ভবনের একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানিয়েছে, নাফিসার বাবা স্কুলের উদ্দেশ্যে সকাল ৭টার দিকে বের হয়ে যান। সকাল ৭টা ৫১ মিনিটে বোরখা পরে ওই বাসার লিফটে ওঠে সাত তলায় যায় গৃহকর্মী আয়েশা।

‎সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে কাঁধে স্কুল ব্যাগ নিয়ে ড্রেস পরে মুখে মাস্ক লাগিয়ে বের হয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নাফিসার বাবা বাসায় ফিরে স্ত্রী ও মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান।

‎তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, মাকে হত্যার পর ওই মেয়েটি দৌড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় হয়তো ইন্টারকমে সিকিউরিটি গার্ডকে ফোন দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে ইন্টারকমের লাইনটি খোলা পাওয়া যায়। মেয়েটি খুব সুন্দরভাবে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে বাথরুমে গিয়ে গোসল করে শরীরের রক্ত পরিষ্কার করে নাফিসার স্কুলের ড্রেস পরে নির্দ্বিধায় গেট দিয়ে বেরিয়ে যায়। ফ্ল্যাটের প্রবেশমুখ থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ। বাসার আলমারিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তছনছ করা।

‎পুলিশ জানায়, তল্লাশি করে বাথরুমে একটি সুইচ গিয়ার ও একটি ধারালো অস্ত্র পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ছুরি দু’টি দিয়ে মা-মেয়েকে হত্যা করে গৃহকর্মী আয়েশা। এ ঘটনায় ওই বাসার দারোয়ান মালেককে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে।

‎তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, বাসায় ধস্তাধস্তির আলামত রয়েছে, মেঝেতে এবং দেয়ালে রক্তের দাগ রয়েছে। আলমারি ও ভ্যানিটি ব্যাগ তছনছ অবস্থায় রয়েছে। যা মনে করছি, প্রাথমিকভাবে কিছু খোয়া যেতে পারে। সিসি ক্যামেরা ফুটেজে আমরা একজনকেই দেখেছি, পরে দেখবো আশপাশে আরও কেউ ছিল কিনা।

‎পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজান জানান, পুলিশ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে খবর পায়। মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখানে নেয়ার পর মারা যায়। পরে লাশ দু’টি সুরতহালের পর ময়নাতদন্তের জন্য সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ।

‎তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্য পেয়েছি, সেসব যাচাই-বাছাই চলছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করছি, হত্যার আগে-পরে তার উপস্থিতি ও অ্যাকটিভিটিজ বিশ্লেষণ করে পরবর্তী তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাবো।

‎পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারা এ ঘটনায় বেশ উদ্বিগ্ন। তারা জানায়, এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি এবং এটি তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এদিকে, আজিজুল ইসলামের সহকর্মীরা ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা শোকাহত অবস্থায় রয়েছে। তারা নাফিসার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একটি শোকসভা আয়োজনের পরিকল্পনা করছে।

‎তদন্তকারীরা আয়েশার অতীত সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে তার রংপুরের গ্রামের বাড়ি ও জেনেভা ক্যাম্পের অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। তার পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলে তার মানসিক অবস্থা ও আচরণের বিষয়ে ধারণা করার চেষ্টা চলছে।

‎পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আয়েশাকে গ্রেপ্তার করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হচ্ছে এবং তার সম্ভাব্য গোপন স্থানের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় স্থানীয় থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে।

‎এদিকে, নিহতদের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তারা আশা করছেন, পুলিশ দ্রুত আয়েশাকে গ্রেপ্তার করে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করবে।

 

‎তথ্যসহায়তাঃমানবজমিন

ট্যাগসঃ

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

মা-মেয়েকে হত্যা করার পর, ঘাতক স্কুল ড্রেস পরে পালিয়ে যায়

আপডেট সময়ঃ ০৭:২৭:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫

‎রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডের একটি বাসায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতেন এম জেড আজিজুল ইসলাম। চারদিন আগে আয়েশা নামের এক নারী গৃহকর্মী হিসেবে কাজে যোগদান করে। গতকাল সকালে আজিজুলের স্ত্রী মালাইলা আফরোজ (৪৮) ও তার মেয়ে নাফিসা বিনতে আজিজ (১৫)কে ছুরি দিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায় গৃহকর্মী আয়েশা। 

‎পালিয়ে যাওয়ার আগে ঘাতক আয়েশা বাথরুমে গোসল করে নিহত নাফিসার স্কুল ড্রেস পরে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে পালায়। 

‎শাহজাহান রোডের ৩২/২/এ বাসার সপ্তম তলার ৭/বি ফ্ল্যাটে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মালাইলা আফরোজ পেশায় গৃহিণী ও নাফিসা মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তবে কি কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে জানা যায়নি এবং ঘাতক আয়েশাকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

‎নিহত নাফিসার বাবা উত্তরার সানবিমস স্কুলের পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক আজিজুল ইসলাম বলেন, বাসায় একজন কাজের মহিলা দরকার ছিল। সাধারণত গেটে অনেকে কাজের সন্ধানে আসেন। চারদিন আগে একটি মেয়ে আসে। বোরকা পরিহিত মেয়েটি বাসার দারোয়ান খালেকের কাছে কাজের সন্ধান করলে সে আমাদের বাসায় পাঠিয়ে দেয়। এরপর আমার স্ত্রী মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে কাজে রেখে দেয়।

‎পরে স্ত্রীর মুখে শুনেছি, মেয়েটার নাম আয়েশা। বয়স আনুমানিক ২০ বছর। তার গ্রামের বাড়ি রংপুর। জেনেভা ক্যাম্পে চাচা-চাচির সঙ্গে থাকে। বাবা-মা আগুনে পুড়ে মারা গেছে। তার শরীরেও আগুনে পোড়ার ক্ষত রয়েছে। তিনি বলেন, মেয়েটা কাজ শুরুর পর প্রথম দু’দিন সময়মতো এসেছে। গতকাল সে সাড়ে ৯টার দিকে আসে। আজ কী হয়েছে, এটা তো আর বলার অবস্থায় নেই।

‎ভবনের একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানিয়েছে, নাফিসার বাবা স্কুলের উদ্দেশ্যে সকাল ৭টার দিকে বের হয়ে যান। সকাল ৭টা ৫১ মিনিটে বোরখা পরে ওই বাসার লিফটে ওঠে সাত তলায় যায় গৃহকর্মী আয়েশা।

‎সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে কাঁধে স্কুল ব্যাগ নিয়ে ড্রেস পরে মুখে মাস্ক লাগিয়ে বের হয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নাফিসার বাবা বাসায় ফিরে স্ত্রী ও মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান।

‎তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, মাকে হত্যার পর ওই মেয়েটি দৌড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় হয়তো ইন্টারকমে সিকিউরিটি গার্ডকে ফোন দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে ইন্টারকমের লাইনটি খোলা পাওয়া যায়। মেয়েটি খুব সুন্দরভাবে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে বাথরুমে গিয়ে গোসল করে শরীরের রক্ত পরিষ্কার করে নাফিসার স্কুলের ড্রেস পরে নির্দ্বিধায় গেট দিয়ে বেরিয়ে যায়। ফ্ল্যাটের প্রবেশমুখ থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ। বাসার আলমারিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তছনছ করা।

‎পুলিশ জানায়, তল্লাশি করে বাথরুমে একটি সুইচ গিয়ার ও একটি ধারালো অস্ত্র পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ছুরি দু’টি দিয়ে মা-মেয়েকে হত্যা করে গৃহকর্মী আয়েশা। এ ঘটনায় ওই বাসার দারোয়ান মালেককে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে।

‎তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, বাসায় ধস্তাধস্তির আলামত রয়েছে, মেঝেতে এবং দেয়ালে রক্তের দাগ রয়েছে। আলমারি ও ভ্যানিটি ব্যাগ তছনছ অবস্থায় রয়েছে। যা মনে করছি, প্রাথমিকভাবে কিছু খোয়া যেতে পারে। সিসি ক্যামেরা ফুটেজে আমরা একজনকেই দেখেছি, পরে দেখবো আশপাশে আরও কেউ ছিল কিনা।

‎পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজান জানান, পুলিশ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে খবর পায়। মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখানে নেয়ার পর মারা যায়। পরে লাশ দু’টি সুরতহালের পর ময়নাতদন্তের জন্য সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ।

‎তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্য পেয়েছি, সেসব যাচাই-বাছাই চলছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করছি, হত্যার আগে-পরে তার উপস্থিতি ও অ্যাকটিভিটিজ বিশ্লেষণ করে পরবর্তী তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাবো।

‎পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারা এ ঘটনায় বেশ উদ্বিগ্ন। তারা জানায়, এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি এবং এটি তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এদিকে, আজিজুল ইসলামের সহকর্মীরা ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা শোকাহত অবস্থায় রয়েছে। তারা নাফিসার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একটি শোকসভা আয়োজনের পরিকল্পনা করছে।

‎তদন্তকারীরা আয়েশার অতীত সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে তার রংপুরের গ্রামের বাড়ি ও জেনেভা ক্যাম্পের অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। তার পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলে তার মানসিক অবস্থা ও আচরণের বিষয়ে ধারণা করার চেষ্টা চলছে।

‎পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আয়েশাকে গ্রেপ্তার করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হচ্ছে এবং তার সম্ভাব্য গোপন স্থানের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় স্থানীয় থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে।

‎এদিকে, নিহতদের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তারা আশা করছেন, পুলিশ দ্রুত আয়েশাকে গ্রেপ্তার করে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করবে।

 

‎তথ্যসহায়তাঃমানবজমিন