সুনামগঞ্জের শাল্লায় সংঘর্ষে প্রাণহানি, পুরুষশূন্য ৪০ বাড়িতে টানা তিন দিন লুটপাটের অভিযোগ
- আপডেট সময়ঃ ০৩:৪৪:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
- / ২৬ বার পড়া হয়েছে।
হকবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট:
সুনামগঞ্জ ।। ০৬ নভেম্বর ২০২৬
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার দুর্গম আটগাঁও ইউনিয়নের নিজগাঁও গ্রামে জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে সংঘর্ষে এক বৃদ্ধ নিহত হওয়ার পর থমথমে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রতিপক্ষের অন্তত ৪০টি বাড়িতে টানা তিন দিন ধরে লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। পুরুষশূন্য বাড়িগুলোতে এই তাণ্ডব চালিয়ে গরু, পাওয়ার টিলার, মোটরসাইকেল, স্বর্ণালংকার, ধান ও নগদ টাকাসহ অর্ধকোটি টাকারও বেশি মূল্যের সম্পদ লুটে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা।
গত ৩১ অক্টোবর দুপুরে নিজগাঁও গ্রামের পূর্বদিকের একটি পতিত জমির দখল নিয়ে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আজব আলী ও ইউনিয়ন কৃষক দলের আহ্বায়ক রূপ মিয়ার লোকজনের মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষ ও হতাহতের সূত্রপাত:
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বর্ষাকালে বিরোধপূর্ণ জমিটি পানিতে তলিয়ে থাকায় উভয় পক্ষই নীরব ছিল। সম্প্রতি হাওরের পানি নেমে যাওয়ায় জমিটি ভেসে উঠলে এর দখল নিয়ে রূপ মিয়া ও আজব আলীর গোষ্ঠীর লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
এ সময় রূপ মিয়ার চাচাতো ভাই আব্দুল মান্নান মিয়া (৬৫) প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন এবং উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেফতার ও প্রতিপক্ষের হামলার আশঙ্কায় আজব আলীর গোষ্ঠীর সব প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও কিশোররা গ্রাম ছেড়ে আত্মগোপন করেন। নারী ও শিশুরা ঘরে তালা ঝুলিয়ে পাশের গ্রামে স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নেন।
টানা তিন দিনের তাণ্ডব ও লুটপাট:
অভিযোগ রয়েছে, পুরুষশূন্য এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের লোকজন ৩১ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে টানা তিন দিন ধরে আজব আলীর গোষ্ঠীর বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪০টি বাড়ি থেকে ৬৭টি গরু, ৫টি পাওয়ার টিলার, ২টি মোটরসাইকেল, ৫টি টিউবওয়েলের সাবমার্সিবল পাম্প, ডিজেলচালিত ২০টি সেচমেশিন, ২টি ধান মাড়াইকল, কয়েকশ’ মণ বীজধান, গোলায় সংরক্ষিত ৪০০ মণ ধান, ২টি ফ্রিজ, ১২টি গ্যাসের চুলা ও সিলিন্ডার, নগদ ৫ লাখ টাকা এবং ৩ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করা হয়েছে। এ ছাড়া হাঁস-মুরগি, নৌকা, আসবাবপত্র ও হাঁড়িপাতিল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। অনেক পরিবারের খড়ের গাদায় আগুন দিয়ে গোখাদ্য পুড়িয়ে দেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগী এক নারীর ভাষ্য, ‘ঘরে অবরুদ্ধ থেকেও শেষ রক্ষা হয়নি। প্রাণ বাঁচাতে ভয়ে দরজা না খুললেও ঘরের বাইরে থাকা আমার দুই ছেলের মেশিন, চারটি গরু ও একটি নৌকা নিয়ে গেছে।’
আরেক ক্ষতিগ্রস্ত নারী মোছা. আসমিনা বেগম জানান, তার বাড়ি থেকে ৪০০ মণ ধান, ১৭টি গরু, নগদ ৫ লাখ টাকাসহ মূল্যবান আসবাবপত্র ও রান্নার সামগ্রী পর্যন্ত লুট করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এখন একটি শূন্য বসতঘর ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই।’
মাহুদা আক্তার নামে আরেক নারী বলেন, ‘নিহতের দাফনকাজ শেষের পরেই লুটপাট শুরু হয়। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বাড়িতে কোনো পুরুষ না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে থানায়ও অভিযোগ করা যায়নি।’
প্রতিপক্ষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বক্তব্য:
এদিকে লুটপাটের সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে নিহত আব্দুল মান্নানের চাচাতো ভাই রূপ মিয়া বলেন, ‘বিরোধপূর্ণ জমি আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি এবং এর কাগজপত্রে মালিক আমার বাবা। আজব আলী অবৈধভাবে দখলের চেষ্টা করে আমার ভাইকে হত্যা করেছে। বর্তমানে আমি নিজেও জখম হয়ে চিকিৎসাধীন আছি।’
আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘মান্নানের দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর আজব আলীর গোষ্ঠীর বাড়িঘরে ব্যাপক হামলা ও লুটপাট হয়েছে। এলাকার দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হয় না, যার সুযোগ দুষ্কৃতকারীরা নিয়ে থাকে।’
প্রশাসনের বক্তব্য:
শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সুহেল জানান, সংঘর্ষে এক বৃদ্ধ নিহত হওয়ার পর পুলিশ পৌঁছানোর আগেই কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে গ্রামের বাজারে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। তিনি আরও জানান, লুটপাটের সুনির্দিষ্ট বিষয়ে এখনো কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি; অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


















