এক দায়বদ্ধ বাংলাদেশের অঙ্গীকারঃ
নতুন ভোরের প্রথম ঈদঃ
- আপডেট সময়ঃ ০৮:০৫:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬
- / ২০ বার পড়া হয়েছে।
বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তার বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করছে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট যে ছাত্র-জনতার বিপ্লব এক দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরাচারী অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়েছিল, সেই অভ্যুত্থান পরবর্তী দেড় বছরের রাষ্ট্র সংস্কারের বন্ধুর পথ পেরিয়ে আজ আমরা একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে প্রথম ঈদ পালন করছি।
এই ঈদ কেবল ঘরে ফেরার চিরাচরিত আনন্দ নয়, বরং এটি ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত ভোটাধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতার এক মহোৎসব। তবে উৎসবের এই মোহময় আবহে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না সেইসব বীর শহীদদের কথা, যাদের তাজা রক্তের বিনিময়ে আজ আমরা এই মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারছি। তাদের আত্মত্যাগই আজকের এই পরিবর্তিত বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর এবং বর্তমান নবনির্বাচিত সরকারের জন্য এক পবিত্র আমানত।
বিগত দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনকাল ছিল মূলত ধ্বংসস্তূপ থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রকে পুনরায় সচল করার এক দুঃসাহসিক লড়াই। আজ নির্বাচিত সরকারের কাঁধে সেই সংস্কারের ধারাকে টেকসই করার গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছে।
জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারকে মনে রাখতে হবে, এই সমর্থন কেবল শাসন করার অধিকার নয়, বরং ৫ই আগস্টের বৈষম্যবিরোধী চেতনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক বিশাল পরীক্ষা। ইতিহাস আমাদের বারবার সতর্ক করেছে যে, ক্ষমতার মোহ অনেক সময় জনবিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়। অতীতের সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন এই নতুন বাংলাদেশে আর না ঘটে, সেটিই আজ সময়ের প্রধান দাবি। বর্তমান সরকারের প্রধান করণীয় হলো রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, যেন গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের দিনটিতে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছায়।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও বাজার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা হবে এই সরকারের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। দীর্ঘদিনের লুটপাট ও অর্থ পাচারের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে হলে আর্থিক খাতে কঠোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য। উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা তখনই আসবে, যখন সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি থেকে রেহাই পাবে এবং বাজার সিন্ডিকেটগুলোর মূলোৎপাটন করে প্রতিটি নাগরিকের পাতে দুবেলা অন্ন নিশ্চিত করা যাবে।
একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু তার বড় বড় অবকাঠামোয় নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে নিহিত। একইসাথে আমাদের অর্থনীতির প্রাণশক্তি কৃষিখাতের দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ হয়। সারের ভরতুকি ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করা সম্ভব।
শিক্ষা ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনা, বর্তমান সরকারের আরেকটি আবশ্যিক দায়িত্ব। ৫ই আগস্টের বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে যে, একটি জাতির মেরুদণ্ড সোজা রাখতে হলে মেধার সঠিক মূল্যায়ন জরুরি।
দলীয় রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস এবং বৈশ্বিক মানসম্পন্ন কারিগরি ও সৃজনশীল শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে, যেন আমাদের তরুণ প্রজন্ম কেবল ডিগ্রিধারী বেকার নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠে। পাঠ্যপুস্তকের সংস্কার থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।
যারা বুক পেতে দিয়ে রাজপথে পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করেছে, সেই তরুণদের স্বপ্ন ছিল এমন এক বাংলাদেশ যেখানে দুর্নীতির কোনো স্থান থাকবে না। সরকার যদি সেই তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয় কিংবা পুনরায় দলীয়করণের পুরনো পথে হাঁটে, তবে গণতন্ত্রের এই নতুন যাত্রা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।
কামনা করি, ২০২৬ সালের এই ঈদ হোক পুনর্মিলনের এবং নতুন জাতীয় সংকল্পের। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি পরিহার করে একটি সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ বজায় রাখা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং গঠনমূলক সমালোচনাকে গ্রহণ করার মানসিকতাই হবে এই সরকারের গণতান্ত্রিক পরিপক্কতার প্রমাণ। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রকৃত অর্থেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।
৫ই আগস্টের চেতনা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন এক বিদ্রোহ—সেই বিদ্রোহের আগুন যেন স্তিমিত না হয়, বরং তা যেন রাষ্ট্র গড়ার সৃজনশীল শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। একটি দায়বদ্ধ সরকার, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা, যুগোপযোগী শিক্ষা এবং স্থিতিশীল অর্থনীতির সমন্বয়ে আমরা যেন সেই সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি, যার স্বপ্ন দেখে আমাদের সন্তানেরা রাজপথে প্রাণ দিয়েছিল।
পরিশেষে, ২০২৬ সালের এই ঈদ হোক একটি অঙ্গীকারের দিন। সরকারকে মনে রাখতে হবে, যে জনগণ তাদের ক্ষমতায় বসিয়েছে, সেই জনগণই তাদের কাজের কঠোর বিচারক।
৫ই আগস্টের সেই বিপ্লবী তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষা—অর্থাৎ একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার পথে সরকার অবিচল থাকবে, এবারের ঈদে দেশবাসীর এটাই পরম প্রত্যাশা। জনগণের আস্থা হারানো মানেই বিপ্লবের চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা। সেই পথে না হেঁটে, সরকার যেন সেবার মানসিকতা নিয়ে এক সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলে।
সবাইকে পবিত্র ঈদের শুভেচ্ছা— ঈদ মোবারক!
সকলের জীবনে কল্যাণ বয়ে আসুক।





















