১১:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬
বদলে যাবে সিলেটের পর্যটন ও অর্থনীতি

আকাশপথের নতুন দিগন্ত: ফের ডানা মেলছে শমসেরনগর বিমানবন্দর

হক বার্তা ডেস্ক রিপোর্টঃ
  • আপডেট সময়ঃ ০৯:৩১:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬
  • / ৫ বার পড়া হয়েছে।

‎সিলেটের আকাশপথে নতুন এক সম্ভাবনার সূর্য উদিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নিস্তব্ধ থাকা মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক শমসেরনগর বিমানবন্দরটি আবারও বাণিজ্যিক ফ্লাইটের জন্য উন্মুক্ত করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। 

ব্রিটিশ আমলের এই বিশালাকার স্থাপনাটি পুনরায় সচল করার উদ্যোগের ফলে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় সূচিত হতে যাচ্ছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

কেবল যাতায়াত নয়, এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের পর্যটন, অর্থনীতি এবং প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণের নতুন পথ খুলে গেছে।

 

‎শমসেরনগর বিমানবন্দরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে কৌশলগত কারণে ব্রিটিশ সরকার ৬০০ একরেরও বেশি জমিতে এই বিমানবন্দরটি গড়ে তুলেছিল। তখনকার সময়ে এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘ রানওয়ে হিসেবে এটি পরিচিত ছিল।

দেশভাগের পর এবং স্বাধীন বাংলাদেশেও সত্তর ও আশির দশকে এখান থেকে নিয়মিত অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল করত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নানা প্রতিকূলতায় এটি যাত্রী পরিবহনের তালিকা থেকে ছিটকে পড়ে।

 

দীর্ঘ সময় এটি বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহৃত হলেও সাধারণ মানুষের জন্য এর দরজা ছিল বন্ধ। বর্তমান সরকারের আকাশপথ আধুনিকায়নের মহাপরিকল্পনার আওতায় এখন এটি পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর হিসেবে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।

‎নতুন এই উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় বিমানবন্দরের বর্তমান অবকাঠামোকে ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। জরাজীর্ণ রানওয়েকে আধুনিক সুপরিসর উড়োজাহাজ ওঠানামার উপযোগী করে শক্তিশালী ও প্রশস্ত করা হবে।

একই সাথে যাত্রীদের আরামদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করতে নির্মাণ করা হবে একটি আধুনিক টার্মিনাল ভবন, যেখানে থাকবে চেক-ইন কাউন্টার, লাউঞ্জ এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এছাড়া ফ্লাইট পরিচালনার জন্য অত্যন্ত জরুরি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার ও নেভিগেশন সিস্টেম স্থাপনের বিষয়টিও এই পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে থাকছে।

 

‎এই বিমানবন্দরটি পুনরায় সচল হওয়ার সবচেয়ে বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে মৌলভীবাজার ও বৃহত্তর সিলেটের পর্যটন শিল্পে। চা-বাগান, পাহাড়ি অরণ্য আর হাওরবেষ্টিত এই জেলাটি দেশের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ হওয়া সত্ত্বেও সরাসরি আকাশপথ না থাকায় অনেক বিদেশি ও উচ্চপদস্থ পর্যটক এখানে আসতে সময় ও যাতায়াত বিড়ম্বনার মুখে পড়তেন।

এখন ঢাকা থেকে মাত্র আধঘণ্টার কিছু বেশি সময়ে শমসেরনগরে পৌঁছানো সম্ভব হবে, যা এই অঞ্চলের রিসোর্ট ও হোটেল ব্যবসায়ীদের জন্য এক স্বর্ণালী সুযোগ তৈরি করবে। সরাসরি বিমান যোগাযোগ স্থাপিত হলে পর্যটন কেন্দ্রিক নতুন নতুন বিনিয়োগের পথও প্রশস্ত হবে।

 

‎অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে শমসেরনগর বিমানবন্দর হবে এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন মেরুদণ্ড। মৌলভীবাজারের চা শিল্প এবং বিভিন্ন মৌসুমি ফলের বাজারজাতকরণে এই বিমানপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পচনশীল পণ্যগুলো দ্রুততম সময়ে রাজধানীতে পৌঁছানোর ফলে স্থানীয় কৃষকরা যেমন ন্যায্য মূল্য পাবেন, তেমনি কার্গো বিমান চলাচলের মাধ্যমে বিদেশে পণ্য পাঠানোর সুবিধাও তৈরি হতে পারে। 

এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কয়েক হাজার মানুষের সরাসরি ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের জিডিপিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বৃহত্তর সিলেটের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাস করেন। মৌলভীবাজারের প্রবাসীদের জন্য শমসেরনগর বিমানবন্দর চালু হওয়া মানেই হলো তাদের দীর্ঘ যাত্রাপথের বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি।

ওসমানী বিমানবন্দরে অবতরণের পর সড়কপথে দীর্ঘ যানজট ঠেলে বাড়ি ফেরার যে কষ্ট, তা এখন এক নিমিষেই দূর হবে। এই অঞ্চলের প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই সরকার এই পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

খুব শীঘ্রই এই বিমানবন্দরের সংস্কার কাজ শুরু হবে এবং রানওয়েতে আবারও উড়োজাহাজের পাখা ঝাপটানোর শব্দ শোনা যাবে- এমনটাই এখন সিলেটবাসীর সর্বজনীন প্রত্যাশা।

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

বদলে যাবে সিলেটের পর্যটন ও অর্থনীতি

আকাশপথের নতুন দিগন্ত: ফের ডানা মেলছে শমসেরনগর বিমানবন্দর

আপডেট সময়ঃ ০৯:৩১:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬

‎সিলেটের আকাশপথে নতুন এক সম্ভাবনার সূর্য উদিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নিস্তব্ধ থাকা মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক শমসেরনগর বিমানবন্দরটি আবারও বাণিজ্যিক ফ্লাইটের জন্য উন্মুক্ত করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। 

ব্রিটিশ আমলের এই বিশালাকার স্থাপনাটি পুনরায় সচল করার উদ্যোগের ফলে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় সূচিত হতে যাচ্ছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

কেবল যাতায়াত নয়, এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের পর্যটন, অর্থনীতি এবং প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণের নতুন পথ খুলে গেছে।

 

‎শমসেরনগর বিমানবন্দরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে কৌশলগত কারণে ব্রিটিশ সরকার ৬০০ একরেরও বেশি জমিতে এই বিমানবন্দরটি গড়ে তুলেছিল। তখনকার সময়ে এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘ রানওয়ে হিসেবে এটি পরিচিত ছিল।

দেশভাগের পর এবং স্বাধীন বাংলাদেশেও সত্তর ও আশির দশকে এখান থেকে নিয়মিত অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল করত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নানা প্রতিকূলতায় এটি যাত্রী পরিবহনের তালিকা থেকে ছিটকে পড়ে।

 

দীর্ঘ সময় এটি বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহৃত হলেও সাধারণ মানুষের জন্য এর দরজা ছিল বন্ধ। বর্তমান সরকারের আকাশপথ আধুনিকায়নের মহাপরিকল্পনার আওতায় এখন এটি পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর হিসেবে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।

‎নতুন এই উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় বিমানবন্দরের বর্তমান অবকাঠামোকে ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। জরাজীর্ণ রানওয়েকে আধুনিক সুপরিসর উড়োজাহাজ ওঠানামার উপযোগী করে শক্তিশালী ও প্রশস্ত করা হবে।

একই সাথে যাত্রীদের আরামদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করতে নির্মাণ করা হবে একটি আধুনিক টার্মিনাল ভবন, যেখানে থাকবে চেক-ইন কাউন্টার, লাউঞ্জ এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এছাড়া ফ্লাইট পরিচালনার জন্য অত্যন্ত জরুরি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার ও নেভিগেশন সিস্টেম স্থাপনের বিষয়টিও এই পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে থাকছে।

 

‎এই বিমানবন্দরটি পুনরায় সচল হওয়ার সবচেয়ে বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে মৌলভীবাজার ও বৃহত্তর সিলেটের পর্যটন শিল্পে। চা-বাগান, পাহাড়ি অরণ্য আর হাওরবেষ্টিত এই জেলাটি দেশের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ হওয়া সত্ত্বেও সরাসরি আকাশপথ না থাকায় অনেক বিদেশি ও উচ্চপদস্থ পর্যটক এখানে আসতে সময় ও যাতায়াত বিড়ম্বনার মুখে পড়তেন।

এখন ঢাকা থেকে মাত্র আধঘণ্টার কিছু বেশি সময়ে শমসেরনগরে পৌঁছানো সম্ভব হবে, যা এই অঞ্চলের রিসোর্ট ও হোটেল ব্যবসায়ীদের জন্য এক স্বর্ণালী সুযোগ তৈরি করবে। সরাসরি বিমান যোগাযোগ স্থাপিত হলে পর্যটন কেন্দ্রিক নতুন নতুন বিনিয়োগের পথও প্রশস্ত হবে।

 

‎অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে শমসেরনগর বিমানবন্দর হবে এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন মেরুদণ্ড। মৌলভীবাজারের চা শিল্প এবং বিভিন্ন মৌসুমি ফলের বাজারজাতকরণে এই বিমানপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পচনশীল পণ্যগুলো দ্রুততম সময়ে রাজধানীতে পৌঁছানোর ফলে স্থানীয় কৃষকরা যেমন ন্যায্য মূল্য পাবেন, তেমনি কার্গো বিমান চলাচলের মাধ্যমে বিদেশে পণ্য পাঠানোর সুবিধাও তৈরি হতে পারে। 

এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কয়েক হাজার মানুষের সরাসরি ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের জিডিপিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বৃহত্তর সিলেটের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাস করেন। মৌলভীবাজারের প্রবাসীদের জন্য শমসেরনগর বিমানবন্দর চালু হওয়া মানেই হলো তাদের দীর্ঘ যাত্রাপথের বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি।

ওসমানী বিমানবন্দরে অবতরণের পর সড়কপথে দীর্ঘ যানজট ঠেলে বাড়ি ফেরার যে কষ্ট, তা এখন এক নিমিষেই দূর হবে। এই অঞ্চলের প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই সরকার এই পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

খুব শীঘ্রই এই বিমানবন্দরের সংস্কার কাজ শুরু হবে এবং রানওয়েতে আবারও উড়োজাহাজের পাখা ঝাপটানোর শব্দ শোনা যাবে- এমনটাই এখন সিলেটবাসীর সর্বজনীন প্রত্যাশা।