সংস্কারকাজে অনিয়মের অভিযোগ, সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কে প্রায় ৬ কোটি টাকার হিসাব
- আপডেট সময়ঃ ০১:৩৬:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৩৯ বার পড়া হয়েছে।
হকবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট;
সুনামগঞ্জ ।। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের সংস্কার কাজ নিয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, মাঠে কাঙ্ক্ষিত কাজের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব না থাকা সত্ত্বেও কাগজপত্রে বিল-ভাউচার প্রস্তুত করে কোটি কোটি টাকার সরকারি অর্থ ছাড়ের আয়োজন করা হয়েছে। প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করার অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
কাগজে পূর্ণাঙ্গ কাজ, বাস্তবে ফাঁকা মাঠ;
সওজ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের ২৩ থেকে ৪৬ কিলোমিটার অংশের সড়ক শক্তিশালীকরণ ও মেরামতের জন্য ‘মেসার্স সালেহ অ্যান্ড ব্রাদার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কার্যাদেশ অনুযায়ী, প্রায় ২ হাজার ৫৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের চারটি নির্দিষ্ট চেইনেজে মাটির কাজ, বেস টাইপ-১, প্রাইম কোট এবং ওয়্যারিং কোর্সসহ নানাবিধ সংস্কার কাজ সম্পন্ন করার কথা ছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, গোবিন্দগঞ্জ-ছাতক সড়কের তকিপুর এবং সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের জাউয়াবাজার, লক্ষ্মনসোম, খারাই ও জানধরটুপিসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে। তবে সরেজমিনে এসব কাজের উল্লেখযোগ্য অংশের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। প্রকল্পের কাগজপত্রে কাজ সমাপ্ত দেখালেও মাঠপর্যায়ে মাটির কাজ কিংবা বিটুমিনাসের স্তরের কোনো উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
সেতুর পরিমাপে অসঙ্গতি;
প্রকল্পের ৪৩ কিলোমিটার অংশে অবস্থিত প্রায় ২৮ মিটার দীর্ঘ একটি সেতুকে কেন্দ্র করেও গুরুতর অনিয়মের প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রাক্কলন ও কাজের হিসাব তৈরির সময় সেতুটির অংশ যথাযথভাবে বাদ বা সমন্বয় করা হয়নি। ফলে বাস্তবে কোনো কাজ না করেই ওই অংশ বাবদ সরকারি অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
নিম্নমানের সামগ্রী ও ল্যাব পরীক্ষায় বাধা;
সংস্কারকাজের গুণগত মান বজায় রাখতে শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট মানের বিটুমিনাস মিশ্রণ তৈরিতে ব্যাচিং প্ল্যান্ট ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি নিম্নমানের ড্রাম মিক্স ও হট মিক্স প্ল্যান্ট ব্যবহার করে কাজ পরিচালনা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অধিকন্তু, কাজের মান পরীক্ষার জন্য ল্যাব টিম সাইটে পৌঁছালেও তাদের মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা পরিচালনায় বাধা দেওয়া হয় এবং পরীক্ষা সম্পন্ন করতে দেওয়া হয়নি।
অনিয়মের প্রতিবাদে কর্মকর্তা বদলির অভিযোগ;
পুরো ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমানের আকস্মিক বদলি। জানা গেছে, প্রকল্পের অসম্পূর্ণ কাজ ও ভুয়া বিলের বিষয়ে আপত্তি জানানোর পরপরই ২০২৬ সালের ১৯ মে এক আদেশে তাকে সিলেট থেকে দিনাজপুর সওজ সার্কেল অফিসে বদলি করা হয়।
এ বিষয়ে মো. হাফিজুর রহমান জানান, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিল-ভাউচারে আপত্তি জানানোর কারণেই তাকে দ্রুততার সঙ্গে বদলি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, মাঠপর্যায়ের তদারকির বিষয়ে জানতে চাইলে ছাতক সড়ক উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শাহদাৎ হোসেন মোবাইল ফোনে বলেন, “সংস্কার কাজ কোথায় হচ্ছে, তা আমি জানি না।” দায়িত্বশীল পদে থেকে তার এমন বক্তব্যে তদারকি ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
প্রভাবশালী ‘সিন্ডিকেটের’ ছায়া;
অভিযোগকারীদের দাবি, সওজের সিলেট জোন, সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগ, ছাতক সড়ক উপবিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পরিমাপ, মান নিয়ন্ত্রণ ও বিল অনুমোদনের প্রতিটি ধাপে প্রভাব বিস্তার করেছে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে সিলেট সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) আবু সাইদ মো. নাজমুল হুদা এবং সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ আহাদ উল্ল্যাহর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউই মুঠোফোন রিসিভ করেননি।
স্বাধীন তদন্তের দাবি;
গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কটি দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন ও যাত্রী সাধারণ চলাচল করেন। কাজের এই নিম্নমান ও অনিয়মের ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সড়কের স্থায়িত্ব ও জননিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
এ অবস্থায় পুরো প্রকল্পের কার্যাদেশ, প্রাক্কলন, চেইনেজভিত্তিক পরিমাপ বই (এমবি), বিল-ভাউচার ও ল্যাব রিপোর্ট স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল। একইসঙ্গে নিরপেক্ষ পুনঃপরিমাপের মাধ্যমে ভুয়া বিলের অর্থ উদ্ধার এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি উঠেছে।










