পৈশাচিকতার চরম সীমা:
সুরক্ষিত হোক আমাদের কন্যাশিশুদের জীবন
- আপডেট সময়ঃ ০২:৫৬:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬
- / ২ বার পড়া হয়েছে।
সমাজে মানুষের নৈতিক অবক্ষয় আর পৈশাচিকতা কোন স্তরে গিয়ে ঠেকেছে, তার এক শিউরে ওঠার মতো চিত্র উঠে এসেছে দৈনিক সমকালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ১১৮ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর অন্তত ১৭টি নিষ্পাপ শিশুকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। শুধু চলতি মে মাসের প্রথম ২০ দিনেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৪ জন শিশু, যার মধ্যে ৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে। পল্লবীতে ৮ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে লাশ খণ্ডবিখণ্ড করা কিংবা মুন্সীগঞ্জে ১০ বছরের শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনাগুলো কেবল অপরাধ নয়, বরং আমাদের সামাজিক ও মানবিক দেউলিয়াত্বের চরম বহিঃপ্রকাশ।
এই পরিসংখ্যান ও ঘটনাগুলো শুধু কিছু সংখ্যা নয়; এগুলো একেকটি নিভে যাওয়া আলো, একেকটি পরিবারের চিরদিনের কান্না। সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধ বিশ্লেষকরা স্পষ্ট করেই বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই নৃশংসতার শিকার শিশুরা তাদের পরিচিত, প্রতিবেশী বা নিকটাত্মীয়দের দ্বারাই নির্যাতিত হচ্ছে।
ঘরের ভেতরে বা চেনা পরিবেশে যেখানে শিশুদের সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা, সেখানেই আজ তারা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। এই পরিস্থিতি কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না।
কিন্তু কেন দিন দিন সমাজ এতোটা হিংস্র আর বিকৃত হয়ে উঠছে? এর পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক কারণ।
মাদকের অবাধ বিস্তার, ইন্টারনেটে বিকৃত ও নীল কনটেন্টের সহজলভ্যতা, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নৈতিকতার চরম অভাব এবং সর্বোপরি—অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি। যেকোনো অপরাধের পর যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দ্রুত নিশ্চিত না হয়, তবে অপরাধীদের মনে আইনের প্রতি ভয় কেটে যায়। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে কঠোর আইন থাকলেও, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক সময় অপরাধীরা পার পেয়ে যায় কিংবা ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বিচার পাওয়ার আশা হারিয়ে ফেলে। অন্যদিকে, অপরাধ আড়াল করতে এবং শিশুটি যেন আইনের আশ্রয় নিতে না পারে, সেই চেনা ভয় থেকে অপরাধীরা ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।
আমরা মনে করি, কেবল আইনের প্রয়োগ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা দিয়ে এই সামাজিক ক্যানসার নিরাময় সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারের এক সমন্বিত প্রতিরোধ। প্রথমত, প্রতিটি ধর্ষণের ও শিশু হত্যার মামলার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অতি দ্রুত শেষ করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সমাজ থেকে মাদক ও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা বিকৃত কনটেন্টের আগ্রাসন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সর্বোপরি, আমাদের পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার পুনর্জাগরণ ঘটাতে হবে। শিশুদের সুরক্ষায় পাড়ায়-মহল্লায় সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তুলতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আজ যদি আমরা আমাদের কন্যাশিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে না পারি, তবে রাষ্ট্র ও সমাজ হিসেবে আমাদের সমস্ত অর্জন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
সরকারের নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের কাছে আমাদের জোরালো দাবি—এই পৈশাচিকতা বন্ধে আর কোনো কালক্ষেপণ নয়, অবিলম্বে কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। আমাদের শিশুরা বাঁচুক নিরাপদে, শান্তিতে।





















