যাদুকাটায় বালু-পাথর লুটে বিএনপি-আ.লীগের আঁতাতের অভিযোগ
- আপডেট সময়ঃ ০৫:১৬:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
- / ২২৬ বার পড়া হয়েছে।
হকবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট;
সুনামগঞ্জ ।। ০৪ অক্টোবর ২০২৬
সুনামগঞ্জ: প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের যাদুকাটা, ধোপাজান ও চেলা নদী থেকে ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন ব্যবহার করে অবাধে লুট করা হচ্ছে বালু ও পাথর। ইজারার মেয়াদ শেষ হলেও স্থানীয় বিএনপি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাকর্মী, প্রশাসন, পুলিশ এবং অসাধু সাংবাদিকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এ লুটপাট অব্যাহত রেখেছে।
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক ‘অতি গোপনীয়’ প্রতিবেদনে এ ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিচয় ভুলে দুই দলের অসাধু নেতারা একাট্টা হয়ে নদী তিনটির ইজারাবহির্ভূত এলাকা ও মেয়াদোত্তীর্ণ মহাল থেকে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি টাকা অবৈধভাবে পকেটে পুরছেন।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে;
ভারতের মেঘালয় সীমান্ত থেকে নেমে আসা যাদুকাটা নদীর অববাহিকায় অবস্থিত বিশ্ব ঐতিহ্য রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওর। সচ্ছ পানি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে নদীটি পর্যটকদের মূল আকর্ষণ। এ ছাড়া, নদীটিতে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন, যার মধ্যে ১৫ হাজারই সনাতনী বারকি শ্রমিক।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নদীটি থেকে বার্ষিক প্রায় ৫ কোটি ঘনফুট বালু এবং ১ কোটি ঘনফুট নুড়ি ও বোল্ডার আহরণ করা সম্ভব। তবে ড্রেজার, বোমা ও সেভ মেশিন দিয়ে তলদেশ থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালু-পাথর তোলার ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে। একই সঙ্গে তীর, বসতি, সড়ক ও খাসজমি ভেঙে পড়ছে এবং হাজার হাজার বারকি শ্রমিকের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
রাজস্ব বঞ্চিত সরকার, নেপথ্যে এমপিসহ প্রভাবশালীরা;
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যাদুকাটা-১ ও ২ নম্বর বালুমহাল বাংলা ১৪৩২ সালের জন্য মোট ১০৭ কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল, যার মেয়াদ গত মার্চে শেষ হয়। মেয়াদ শেষে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনি তৎপরতায় শৈথিল্যের সুযোগে ইজারাদার নাছির মিয়া ও শাহ রুবেল আহমেদ হাইকোর্টে রিট করে বালু তোলা অব্যাহত রাখেন। এর ফলে সরকার প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারিয়েছে।
এসবির প্রতিবেদনে সুনামগঞ্জের ৩ জন সংসদ সদস্যের নাম উঠে এসেছে। তারা হলেন—
কামরুজ্জামান কামরুল (সুনামগঞ্জ-১)
নুরুল ইসলাম নুরুল (সুনামগঞ্জ-৪)
কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন (সুনামগঞ্জ-৫)
অভিযোগ রয়েছে, এসব সংসদ সদস্য বালু ব্যবসা, টেন্ডার ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা ও একাধিক জুলাই-বিপ্লব মামলার আসামি, তাহিরপুরের বালিজুরি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগ নেতা আজাদ হোসেন ওই ৩ এমপির সঙ্গে মিলে বালু-পাথর ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এ ছাড়া জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক খন্দকার মঞ্জুর হোসেন এমপি কামরুলকে একটি ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি উপহার দিয়ে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
অন্যদিকে, ধোপাজান নদীতে এমপি নুরুল ইসলামের হয়ে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে মানিক মেম্বার নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। সেখানে প্রতি ফুট বালুর জন্য ৫ টাকা, নৌকা প্রতি ২ হাজার টাকা এবং নদীর প্রবেশমুখে প্রতি ঘনফুটে আরও ১০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
প্রতিদিন ৩ কোটি টাকার বাঁটোয়ারা;
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নদী তিনটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি টাকার অবৈধ চাঁদা ও বালু বিক্রির টাকা আদায় করা হয়। এই অর্থ নির্দিষ্ট হারে ভাগাভাগি হচ্ছে:
৫০% যায় বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী অংশে।
১৫% পায় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী চক্র।
৩৫% ভাগ বাটোয়ারা হয় অসাধু প্রশাসন, পুলিশ ও স্থানীয় এক শ্রেণির সাংবাদিকদের মধ্যে।
এ ছাড়া চেলা ও যাদুকাটা নদীতে ‘এসপির ভাতিজা’ ও ছাত্রলীগ নেতাদের পরিচয়ে একাধিক ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু তোলার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও প্রশাসনের অবস্থান;
যোগসাজশের বিষয়ে জানতে চাইলে বালিজুরি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আজাদ হোসেন দাবি করেন, “বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেউ বালু তোলার সঙ্গে যুক্ত নয়। সব এমপি নুরুল ইসলাম ও এমপি কামরুজ্জামান কামরুল করছেন। তারা নাছির ও রুবেলকে দিয়ে কাজ করাচ্ছেন।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, “কেউ আমার নাম ব্যবহার করে থাকতে পারে, তবে আমি কোনো অনিয়মে জড়িত নই।” সুনামগঞ্জ-১ ও ৫ আসনের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পুরো বিষয়ের আইনি জটিলতা ও বর্তমান অচলাবস্থা নিয়ে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানান, হাইকোর্টের রিট ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের ওপর ভিত্তি করেই জেলা প্রশাসন আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, “যাদুকাটার বালুমহাল কেন্দ্র করে মূলত দুটি গ্রুপ সক্রিয়। তাহিয়া স্টোন ক্রাশারের নাছির কাজ করেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপির পক্ষে এবং জিনান এন্টারপ্রাইজের রুবেল কাজ করেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের এমপির পক্ষে। আদালতের স্থগিতাদেশ ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বিষয়টি পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। আমরা ভূমি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় আছি।”
পুলিশের পক্ষ থেকে এই অবৈধ বালু উত্তোলন, ইজারার মেয়াদ শেষের পরও কার্যক্রম চালানো এবং রাজনৈতিক-প্রশাসনিক সিন্ডিকেটের চাঁদা আদায়ের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।














