জ্বালানি খাতে ছায়া বিপিসিঃ
এক চিকিৎসকের কবজায় দেশের ৮০ শতাংশ পরিশোধিত তেল
- আপডেট সময়ঃ ১০:২৯:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬
- / ১৭ বার পড়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন এক ব্যক্তি ও তার সিন্ডিকেটের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে বছরে যে পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, তার প্রায় ৮০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করছেন ডা. এজাজুর রহমান নামের এক প্রভাবশালী চিকিৎসক।
গত দেড় দশকে অত্যন্ত সুকৌশলে তিনি বিপিসির ভেতর ও বাইরে এমন এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন, যা এখন জ্বালানি খাতের সমান্তরাল একটি ‘ছায়া প্রতিষ্ঠানে’ পরিণত হয়েছে।
ডা. এজাজুর রহমানের উত্থানকাহিনী পর্যালোচনায় দেখা যায়, চট্টগ্রামের এই চিকিৎসক সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর চিকিৎসা পেশার চেয়ে ব্যবসায়িক কৌশলে বেশি মনোযোগী হন।
২০০৯ সালের পর থেকে তিনি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিপিসির জ্বালানি আমদানির প্রতিটি স্তরে নিজের শক্ত খুঁটি গেঁড়ে বসেন। বর্তমানে তিনি ‘সেভেন মার্ক’ এবং ‘ট্রান্সবাংলা কমোডিটিস লিমিটেড’ নামক দুটি প্রধান প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপিসির আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণ করছেন।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই আধিপত্যের ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। বিপিসির তালিকাভুক্ত ১১টি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬টি প্রতিষ্ঠানেরই স্থানীয় প্রতিনিধি বা এজেন্ট হলেন ডা. এজাজ। এর মধ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুরের ইউনিপেক, ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিন, মালয়েশিয়ার পিটিএলসিএল, থাইল্যান্ডের পিটিটিটি এবং সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়া ও সায়নোকেম।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৫৫ লাখ ১০ হাজার টন। এর মধ্যে ডা. এজাজের এজেন্টশিপে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো ৪৩ লাখ টনেরও বেশি জ্বালানি সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছে।
সহজ কথায়, দেশের মোট আমদানির প্রায় ৭৮ থেকে ৮০ শতাংশই এই একজনের হাতের ইশারায় পরিচালিত হচ্ছে।
বিপিসি সাধারণত জি-টু-জি (সরকার টু সরকার) এবং উন্মুক্ত দরপত্র—এই দুই পদ্ধতিতে জ্বালানি সংগ্রহ করে। ডা. এজাজুর রহমান অত্যন্ত চতুরতার সাথে দুই পদ্ধতিতেই নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছেন।
আন্তর্জাতিক বড় বড় তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে লিয়াজোঁ করে তিনি তাদের লোকাল এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন।
এতে করে কোন প্রতিষ্ঠান কত দরে বা কোন প্রলুব্ধকর শর্তে প্রস্তাব দেবে, তার সবকিছুই এই সিন্ডিকেটের নখদর্পণে থাকে। এমনকি জাহাজ ভাড়ার অতিরিক্ত অর্থ বা ‘প্রিমিয়াম’ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এই সিন্ডিকেট ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে, যার চূড়ান্ত বোঝা বইতে হয় সাধারণ জনগণকে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেও এই সিন্ডিকেটের নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হয়েছে। সম্প্রতি ইউনিপেক এবং পিটিএলসিএল নামের দুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এপ্রিল মাসের নির্ধারিত কিছু জ্বালানি পার্সেল পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করেছে।
তারা যুদ্ধাবস্থাকে ‘ফোর্স মেজার’ বা অনিবার্য দুর্ঘটনা হিসেবে অজুহাত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আমদানির উৎস যদি কোনো নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তির হাতে জিম্মি থাকে, তবে জাতীয় সংকটের সময় সেই ব্যক্তি বা তার প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল করার সুযোগ পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি খাতের মতো একটি স্পর্শকাতর সেক্টরে এমন একক আধিপত্য জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত। বিপিসি একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও কেন তারা বিকল্প এবং বৈচিত্র্যময় সরবরাহকারী গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
একক সিন্ডিকেটের ওপর এই অতি-নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হওয়া বা অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মতো বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
যদিও ডা. এজাজুর রহমান তার বিরুদ্ধে ওঠা সব ধরনের সিন্ডিকেট ও কারসাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে বিপিসির সরবরাহ তালিকার নথি এবং বিপুল অংকের কার্যাদেশের পরিসংখ্যানই বলে দেয় যে, পুরো খাতটি এখন এক ব্যক্তির একক নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।














