নজরদারির অভাব: অবাধে বালু উত্তোলনে রূপ হারাচ্ছে নদীর তীর ও জমি
- আপডেট সময়ঃ ০২:৫৬:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫ বার পড়া হয়েছে।
হকবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট;
সুনামগঞ্জ ।। ১০ অক্টোবর ২০২৬
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসনের নজরদারির তোয়াক্কা না করে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরে ইজারাবিহীন নদী, খাল ও ছড়া থেকে অবাধে লুট হচ্ছে বালু। রাত-দিন সমান তালে সড়কপথে ট্রাক্টর, ট্রলি ও পিকআপ ভর্তি করে বালু পাচার করছে একটি প্রভাবশালী চক্র। অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে ইতোমধ্যেই স্থানীয় ভূ-প্রকৃতি ও মানচিত্রে এসেছে আশঙ্কাজনক পরিবর্তন। হুমকির মুখে পড়েছে বসতবাড়ি, ফসলি জমি এবং পাকা সড়ক।
অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কিছু অসাধু ব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশ রেখেই চক্রটি এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে, এই নৈরাজ্যের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কিংবা প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও সাংবাদিকরা সংঘবদ্ধ আক্রমণের শিকার হচ্ছেন বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বালু পাচারের রুট ও চিত্র;
বিগত কয়েক দিন ধরে সরজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপজেলার চালবান, বাঘবেড়, মতুরকান্দি, কাপনা এবং কারেন্টবাজার সড়ক পথ ব্যবহার করে কাপনা খাল ও ধোপাজান নদী থেকে প্রতিনিয়ত বালু লুট করা হচ্ছে। দিনের বেলায় বালুবোঝাই পরিবহনের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও, রাতের আঁধারে ৫০টিরও বেশি ট্রলি, নসিমন ও পিকআপে করে বালু পাচার করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বালুবোঝাই প্রতিটি পরিবহন থেকে ২০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করছে একটি সুনির্দিষ্ট চক্র। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই অবৈধ চাঁদাবাজি ও বালু পাচার প্রক্রিয়ার প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে কারেন্টের বাজার এলাকার ‘রুমেল’ নামে এক যুবকের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।
কারেন্টের বাজার এলাকার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানান, “রাতে মতুরকান্দি হয়ে সারারাত বালুর ট্রলি চলাচল করে। এর পেছনে বড় একটি সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা প্রশাসন ও পুলিশকে ম্যানেজ করে এসব করছে। ভয়ে কেউ মুখ খোলে না। কদিন আগে বালু পরিবহনের দৃশ্য ধারণ করতে গেলে এক সাংবাদিকের ওপর চড়াও হয় চক্রের সদস্যরা। প্রতিবাদ করলেই ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়।”
ইউপি সদস্যের বক্তব্য ও অভিযুক্তদের পরিচয়;
বালু লুটের সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পলাশ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শফিকুল ইসলাম স্বীকার করেন, “রাতে কিছু বালুর ট্রলি চলাচলের বিষয় জানা আছে, তবে আমাদের এতে কোনো সম্পৃক্ততা নেই।” এক সাংবাদিককে আটকে রেখে ভিডিও ডিলেট করার হুমকির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এক সাংবাদিকের ভিডিও করাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়রা উত্তেজিত হয়েছিল, পরে আমরা বিষয়টি মীমাংসা করে দিয়েছি। এলাকায় টুকটাক কিছু ছেলেপেলে বালু আনে।”
তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, মূলত কারেন্টের বাজার এলাকার ব্যবসায়ী রুমেলের নিয়ন্ত্রণেই চলছে এই বালু সাম্রাজ্য। অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এছাড়া উপজেলার সলুবাদ ইউনিয়নের মথুরকান্দি ও কাপনা এলাকায় গিয়ে দেখা যায় বালু উত্তোলনের বিভীষিকাময় চিত্র। নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে ইতোমধ্যেই কাপনা খাল ও আশপাশের জমির আকৃতি পুরোপুরি বদলে গেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে স্থানীয় গুচ্ছগ্রামের ঘরবাড়ি ও মথুরকান্দি সংযোগ সড়ক।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এই অপকর্মের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে এলাকার মিজানুর, হাফিজ, সুলেমান, শাহজাহান, দীন ইসলাম, বিল্লাল, ইউনুস, সবুজ, জুলহাস ও সাদ্দামসহ একাধিক ব্যক্তি।
কার্যকর পদক্ষেপের অভাব ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য;
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও বিশ্বম্ভরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহাদ উল্যা ভুইয়া দাবি করেন, “সড়কপথে বালু লুটের এমন কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই। তবে তদন্ত সাপেক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আমরা অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
অন্যদিকে, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সকিনা আক্তার। তিনি বলেন, “বালু খেকোদের ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত সতর্ক। ঘটনাস্থলে অভিযানে গেলে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না, অপরাধীরা পালিয়ে যায়। বালু লুট বন্ধে স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছি এবং এ কাজে সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করছি।”
প্রশাসনের আশ্বাস সত্ত্বেও বাস্তবে বালু পাচার বন্ধ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় সচেতন মহল। দ্রুত এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরিবেশ ও স্থানীয় জনগণের সম্পদ রক্ষা করার জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।




















