০৩:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

সুদুর আমেরিকায় থেকেও প্রধান আসামি;প্রশ্নের মুখে বিচার

রিপোর্টার নামঃ
  • আপডেট সময়ঃ ০২:০৮:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৬৫ বার পড়া হয়েছে।

Writing
বিশেষ সম্পাদকীয়
মামলা নয়, ন্যায়বিচারই হোক রাষ্ট্রের শেষ কথা
একটি মামলা কেবল কয়েকটি নাম ও ধারার সমষ্টি নয়; একটি মামলা মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় অবস্থান কিংবা প্রতিহিংসার অভিযোগকে কেন্দ্র করে কাউকে আসামি করার আগে ঘটনাটির বাস্তবতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান এবং অভিযোগের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
বিশ্বম্ভরপুর থানায় একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলায় সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নোমান বখত পলিনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে—এমন তথ্য সামনে এসেছে। একই সঙ্গে তার দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে
এফআইআর প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট—কোনো ব্যক্তি থানায় অভিযোগ দায়ের করিলে পুলিশ প্রাথমিক ভাবে তদন্ত করে যদি ঘটনার সত্যতা পায় তবেই মামলা এফআইআর হিসাবে গন্য করা হয়,
ঘটনার সঙ্গে ব্যক্তির প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ কী ছিল? পুলিশের না জানার কথা না যে পলিন বখত বর্তমানে আমেরিকায় অবস্থান করছেন তারপরও এফআইআরভুক্ত আসামি হিসাবে গন্য করা হলো কেমনে! কেন তাকে মামলার প্রধান আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই পাওয়া উচিত।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—এফআইআর কোনো ঘটনার চূড়ান্ত সত্যতার সনদ নয়। এফআইআর হলো পুলিশের কাছে কোনো অপরাধ সম্পর্কে পাওয়া প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে নথিভুক্ত মামলা; অভিযোগের সত্যতা শেষ পর্যন্ত তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়। তাই এফআইআরে কারও নাম থাকা মানেই তিনি অপরাধী—এমন ধারণা যেমন আইনসম্মত নয়, তেমনি তদন্তের আগেই কাউকে সামাজিকভাবে অপরাধী বানানোও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
জুলাই আন্দোলনের সময় সাধারণ মানুষের অন্যতম বড় প্রত্যাশা ছিল—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও জবাবদিহিমূলক হবে, পুলিশ হবে জনগণের নিরাপত্তার নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত নিশ্চিত হবে এবং আইনের চোখে সবাই সমান মর্যাদা পাবেন। সেই প্রত্যাশা যদি বাস্তবে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মামলা যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি, ভয় দেখানো কিংবা প্রতিশোধ নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়—এমন অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারও বিরুদ্ধে সত্যিকারের অপরাধের প্রমাণ থাকলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে; কিন্তু কেবল রাজনৈতিক পরিচয় বা বিরোধের কারণে মামলা দেওয়া হলে সেটিও সমানভাবে প্রশ্নের মুখে পড়বে।
আমরা বিশ্বাস করি, ন্যায়বিচার মানে কারও পক্ষ নেওয়া নয়; ন্যায়বিচার মানে সত্যকে পক্ষপাতহীনভাবে খুঁজে বের করা। যে অপরাধী, তার পরিচয় যাই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। আর যে নির্দোষ, তার রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, তাকে হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে হবে।
তাই বিশ্বম্ভরপুরের এই মামলাসহ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দায়ের হওয়া প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে আমরা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তের দাবি জানাই। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলুক; আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে নির্দোষ ব্যক্তির নাম মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পথও উন্মুক্ত রাখতে হবে।
তাছাড়া ৫ আগষ্টের পরে যে কয়টা মামলা হয়েছে প্রত্যেক মামলায় অজ্ঞাত আসামির নামে বিশাল বানিজ্যের অভিযোগ আছে শুধু এখানেই শেষ না,মামলার জামিন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রকে পুজি করে বিএনপির তথাকথিত কিছু নেতা ৫ আগষ্টের পরে ৪/৫ তলা বিল্ডিংয়ের মালিক হয়েছেন মর্মে জনস্রোতি আছে! যা বিচার ব্যবস্থার এক কালো অধ্যায় হিসাবে ইতিহাসে থাকবে!
জুলাইয়ের আন্দোলনে মানুষ শুধু সরকার পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেনি; তারা বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা, পুলিশের সংস্কার, জবাবদিহি এবং আইনের সমান প্রয়োগ চেয়েছিল। সেই প্রত্যাশার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়—প্রমাণ, আইন ও ন্যায়বিচারকেই রাষ্ট্রের পথনির্দেশক করতে হবে।
মামলা হতে পারে তদন্তের সূচনা; কিন্তু মামলা কখনোই কারও অপরাধ প্রমাণের শেষ কথা নয়। শেষ কথা বলবে প্রমাণ ও আদালত।
— সম্পাদকীয় বিভাগ
দৈনিক হক বার্তা
(অন্তরালের খবর), সুনামগঞ্জ

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

সুদুর আমেরিকায় থেকেও প্রধান আসামি;প্রশ্নের মুখে বিচার

আপডেট সময়ঃ ০২:০৮:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

Writing
বিশেষ সম্পাদকীয়
মামলা নয়, ন্যায়বিচারই হোক রাষ্ট্রের শেষ কথা
একটি মামলা কেবল কয়েকটি নাম ও ধারার সমষ্টি নয়; একটি মামলা মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় অবস্থান কিংবা প্রতিহিংসার অভিযোগকে কেন্দ্র করে কাউকে আসামি করার আগে ঘটনাটির বাস্তবতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান এবং অভিযোগের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
বিশ্বম্ভরপুর থানায় একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলায় সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নোমান বখত পলিনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে—এমন তথ্য সামনে এসেছে। একই সঙ্গে তার দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে
এফআইআর প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট—কোনো ব্যক্তি থানায় অভিযোগ দায়ের করিলে পুলিশ প্রাথমিক ভাবে তদন্ত করে যদি ঘটনার সত্যতা পায় তবেই মামলা এফআইআর হিসাবে গন্য করা হয়,
ঘটনার সঙ্গে ব্যক্তির প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ কী ছিল? পুলিশের না জানার কথা না যে পলিন বখত বর্তমানে আমেরিকায় অবস্থান করছেন তারপরও এফআইআরভুক্ত আসামি হিসাবে গন্য করা হলো কেমনে! কেন তাকে মামলার প্রধান আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই পাওয়া উচিত।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—এফআইআর কোনো ঘটনার চূড়ান্ত সত্যতার সনদ নয়। এফআইআর হলো পুলিশের কাছে কোনো অপরাধ সম্পর্কে পাওয়া প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে নথিভুক্ত মামলা; অভিযোগের সত্যতা শেষ পর্যন্ত তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়। তাই এফআইআরে কারও নাম থাকা মানেই তিনি অপরাধী—এমন ধারণা যেমন আইনসম্মত নয়, তেমনি তদন্তের আগেই কাউকে সামাজিকভাবে অপরাধী বানানোও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
জুলাই আন্দোলনের সময় সাধারণ মানুষের অন্যতম বড় প্রত্যাশা ছিল—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও জবাবদিহিমূলক হবে, পুলিশ হবে জনগণের নিরাপত্তার নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত নিশ্চিত হবে এবং আইনের চোখে সবাই সমান মর্যাদা পাবেন। সেই প্রত্যাশা যদি বাস্তবে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মামলা যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি, ভয় দেখানো কিংবা প্রতিশোধ নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়—এমন অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারও বিরুদ্ধে সত্যিকারের অপরাধের প্রমাণ থাকলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে; কিন্তু কেবল রাজনৈতিক পরিচয় বা বিরোধের কারণে মামলা দেওয়া হলে সেটিও সমানভাবে প্রশ্নের মুখে পড়বে।
আমরা বিশ্বাস করি, ন্যায়বিচার মানে কারও পক্ষ নেওয়া নয়; ন্যায়বিচার মানে সত্যকে পক্ষপাতহীনভাবে খুঁজে বের করা। যে অপরাধী, তার পরিচয় যাই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। আর যে নির্দোষ, তার রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, তাকে হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে হবে।
তাই বিশ্বম্ভরপুরের এই মামলাসহ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দায়ের হওয়া প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে আমরা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তের দাবি জানাই। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলুক; আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে নির্দোষ ব্যক্তির নাম মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পথও উন্মুক্ত রাখতে হবে।
তাছাড়া ৫ আগষ্টের পরে যে কয়টা মামলা হয়েছে প্রত্যেক মামলায় অজ্ঞাত আসামির নামে বিশাল বানিজ্যের অভিযোগ আছে শুধু এখানেই শেষ না,মামলার জামিন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রকে পুজি করে বিএনপির তথাকথিত কিছু নেতা ৫ আগষ্টের পরে ৪/৫ তলা বিল্ডিংয়ের মালিক হয়েছেন মর্মে জনস্রোতি আছে! যা বিচার ব্যবস্থার এক কালো অধ্যায় হিসাবে ইতিহাসে থাকবে!
জুলাইয়ের আন্দোলনে মানুষ শুধু সরকার পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেনি; তারা বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা, পুলিশের সংস্কার, জবাবদিহি এবং আইনের সমান প্রয়োগ চেয়েছিল। সেই প্রত্যাশার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়—প্রমাণ, আইন ও ন্যায়বিচারকেই রাষ্ট্রের পথনির্দেশক করতে হবে।
মামলা হতে পারে তদন্তের সূচনা; কিন্তু মামলা কখনোই কারও অপরাধ প্রমাণের শেষ কথা নয়। শেষ কথা বলবে প্রমাণ ও আদালত।
— সম্পাদকীয় বিভাগ
দৈনিক হক বার্তা
(অন্তরালের খবর), সুনামগঞ্জ