১২:৫৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬
মন্তব্য প্রতিবেদন

একজন প্রিন্সকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে সরকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করল পুলিশ?

হকবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময়ঃ ১২:৫৫:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
  • / ১৯০ বার পড়া হয়েছে।

 

মন্তব্য প্রতিবেদন | ০৩ নভেম্বর ২০২৬

দৈনিক হক বার্তা (অন্তরালের খবর), সুনামগঞ্জ

 

বর্তমান সরকারের সামনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রশাসনিক অস্থিরতা কাটিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের সময়ে পুলিশের প্রতিটি পদক্ষেপ হওয়া উচিত ছিল অধিকতর সংযত, পেশাদার ও আইননির্ভর। অথচ সুনামগঞ্জের নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা দেওয়ান শাহনেওয়াজ চৌধুরী প্রিন্সকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে উল্টো চিত্রই দৃশ্যমান।

 

প্রশ্ন হচ্ছে, প্রিন্সকে এত জরুরি ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল? সংবাদে জানা যায়, তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই একাধিক মামলা ছিল এবং পরিবারের দাবি, সেসব মামলায় তিনি জামিনে ছিলেন। তাহলে কোন মামলায়, কী নতুন আইনগত পরিস্থিতিতে তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হলো? জামিন বহাল থাকলে নতুন গ্রেপ্তারের ভিত্তি কী ছিল? এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পুলিশের দেওয়া উচিত।

 

গ্রেপ্তারের পর থানা হেফাজতে অসুস্থ হওয়া, নির্যাতনের অভিযোগ, হাসপাতাল পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ এবং পরবর্তী সময়ে সিলেটের হাসপাতাল থেকে মা-বাবা, ভাই-বোন ও বন্ধুদের গ্রেপ্তার—প্রতিটি পর্যায়েই পুলিশের পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

 

পুলিশের ওপর হামলা কিংবা আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকলে অবশ্যই তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের প্রশিক্ষণ, কৌশল ও সংযম কোথায় ছিল? পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কি সম্ভব ছিল না? প্রত্যেকের বিরুদ্ধে পৃথক অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা যাচাই না করে পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তার করার যৌক্তিকতা কী?

আরও বিস্ময়কর, পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় প্রিন্সের লাইভ সম্প্রচার ও তার অবস্থার জনসমক্ষে প্রদর্শনের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো? গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশেরই। গ্রেপ্তার কি আইন প্রয়োগ, নাকি জনসমক্ষে শক্তি প্রদর্শনের মহড়া?

 

জাতিসংঘের ১৯৯০ সালের বলপ্রয়োগ নীতিমালা বলছে, পুলিশকে অহিংস পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে; বলপ্রয়োগ হবে অপরিহার্য ও আনুপাতিক। বাংলাদেশের সংবিধানও ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের আশ্রয় এবং নির্যাতন থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিয়েছে।

 

সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিণতিটিও বিবেচনা করা দরকার। প্রিন্সের রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আদালতে প্রমাণ হোক, অপরাধী হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হোক। কিন্তু পুলিশের অতিউৎসাহ ও প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ যদি একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে রাজনৈতিক প্রচারণার কেন্দ্রে নিয়ে আসে, তাহলে লাভবান হবে কারা?

যে রাজনৈতিক শক্তিকে সরকার রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে চায়, পুলিশের এমন আচরণ তাদের হাতেই নতুন প্রচারণার উপাদান তুলে দিতে পারে। শেখ হাসিনা, সাদ্দামসহ সাবেক ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া সেই রাজনৈতিক প্রচারণার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

একজন প্রিন্স অপরাধী হলে তাকে আইনের আওতায় আনুন; কিন্তু তাকে অযথা রাজনৈতিক নায়কে পরিণত করার দায় পুলিশ এড়াবে কীভাবে?

সরকারের মনে রাখা উচিত, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার পুলিশি বাড়াবাড়ি নয়, আইনের শাসন ও পেশাদার প্রশাসন। পুলিশের একটি ভুল পদক্ষেপ কখনো কখনো সরকারের অনেক রাজনৈতিক অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে।

প্রশ্ন তাই প্রিন্সকে নিয়ে নয়, প্রশ্ন পুলিশের পেশাদারিত্ব নিয়ে; প্রশ্ন সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে।

 

— অ্যাডভোকেট আমিরুল হক

সম্পাদক, দৈনিক হক বার্তা (অন্তরালের খবর), সুনামগঞ্জ

স্লোগান: বই নামে তৃতীয় নয়নে জীবন দর্শন।

ট্যাগসঃ

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

মন্তব্য প্রতিবেদন

একজন প্রিন্সকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে সরকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করল পুলিশ?

আপডেট সময়ঃ ১২:৫৫:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

 

মন্তব্য প্রতিবেদন | ০৩ নভেম্বর ২০২৬

দৈনিক হক বার্তা (অন্তরালের খবর), সুনামগঞ্জ

 

বর্তমান সরকারের সামনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রশাসনিক অস্থিরতা কাটিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের সময়ে পুলিশের প্রতিটি পদক্ষেপ হওয়া উচিত ছিল অধিকতর সংযত, পেশাদার ও আইননির্ভর। অথচ সুনামগঞ্জের নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা দেওয়ান শাহনেওয়াজ চৌধুরী প্রিন্সকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে উল্টো চিত্রই দৃশ্যমান।

 

প্রশ্ন হচ্ছে, প্রিন্সকে এত জরুরি ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল? সংবাদে জানা যায়, তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই একাধিক মামলা ছিল এবং পরিবারের দাবি, সেসব মামলায় তিনি জামিনে ছিলেন। তাহলে কোন মামলায়, কী নতুন আইনগত পরিস্থিতিতে তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হলো? জামিন বহাল থাকলে নতুন গ্রেপ্তারের ভিত্তি কী ছিল? এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পুলিশের দেওয়া উচিত।

 

গ্রেপ্তারের পর থানা হেফাজতে অসুস্থ হওয়া, নির্যাতনের অভিযোগ, হাসপাতাল পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ এবং পরবর্তী সময়ে সিলেটের হাসপাতাল থেকে মা-বাবা, ভাই-বোন ও বন্ধুদের গ্রেপ্তার—প্রতিটি পর্যায়েই পুলিশের পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

 

পুলিশের ওপর হামলা কিংবা আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকলে অবশ্যই তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের প্রশিক্ষণ, কৌশল ও সংযম কোথায় ছিল? পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কি সম্ভব ছিল না? প্রত্যেকের বিরুদ্ধে পৃথক অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা যাচাই না করে পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তার করার যৌক্তিকতা কী?

আরও বিস্ময়কর, পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় প্রিন্সের লাইভ সম্প্রচার ও তার অবস্থার জনসমক্ষে প্রদর্শনের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো? গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশেরই। গ্রেপ্তার কি আইন প্রয়োগ, নাকি জনসমক্ষে শক্তি প্রদর্শনের মহড়া?

 

জাতিসংঘের ১৯৯০ সালের বলপ্রয়োগ নীতিমালা বলছে, পুলিশকে অহিংস পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে; বলপ্রয়োগ হবে অপরিহার্য ও আনুপাতিক। বাংলাদেশের সংবিধানও ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের আশ্রয় এবং নির্যাতন থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিয়েছে।

 

সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিণতিটিও বিবেচনা করা দরকার। প্রিন্সের রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আদালতে প্রমাণ হোক, অপরাধী হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হোক। কিন্তু পুলিশের অতিউৎসাহ ও প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ যদি একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে রাজনৈতিক প্রচারণার কেন্দ্রে নিয়ে আসে, তাহলে লাভবান হবে কারা?

যে রাজনৈতিক শক্তিকে সরকার রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে চায়, পুলিশের এমন আচরণ তাদের হাতেই নতুন প্রচারণার উপাদান তুলে দিতে পারে। শেখ হাসিনা, সাদ্দামসহ সাবেক ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া সেই রাজনৈতিক প্রচারণার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

একজন প্রিন্স অপরাধী হলে তাকে আইনের আওতায় আনুন; কিন্তু তাকে অযথা রাজনৈতিক নায়কে পরিণত করার দায় পুলিশ এড়াবে কীভাবে?

সরকারের মনে রাখা উচিত, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার পুলিশি বাড়াবাড়ি নয়, আইনের শাসন ও পেশাদার প্রশাসন। পুলিশের একটি ভুল পদক্ষেপ কখনো কখনো সরকারের অনেক রাজনৈতিক অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে।

প্রশ্ন তাই প্রিন্সকে নিয়ে নয়, প্রশ্ন পুলিশের পেশাদারিত্ব নিয়ে; প্রশ্ন সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে।

 

— অ্যাডভোকেট আমিরুল হক

সম্পাদক, দৈনিক হক বার্তা (অন্তরালের খবর), সুনামগঞ্জ

স্লোগান: বই নামে তৃতীয় নয়নে জীবন দর্শন।