০৪:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
মাত্র ৪৫ হাজারে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার স্বপ্নঃ

শত শত পাসপোর্ট ও কোটি টাকা নিয়ে চম্পট ট্রাভেল এজেন্সি

হক বার্তা ডেস্ক রিপোর্টঃ
  • আপডেট সময়ঃ ০৪:০৩:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
  • / ০ বার পড়া হয়েছে।

‎ফেসবুকের ওয়ালে চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন, ঢাকার অভিজাত এলাকায় চোখধাঁধানো অফিস আর চা-মিষ্টির রাজকীয় আপ্যায়ন। স্বপ্নের দেশ অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার মোহে অন্ধ করতে এতটুকুই যথেষ্ট ছিল। 

‎মাত্র ৪৫ হাজার টাকায় উন্নত জীবনের আশায় বুক বেঁধেছিলেন পাবনার বেকার যুবক ফারুক হোসেনসহ দেশের বিভিন্ন জেলার শত শত সাধারণ মানুষ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন রূপ নিয়েছে এক দুঃস্বপ্নে। 

‎শত শত পাসপোর্ট আর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বনানীর সাজানো অফিস গুটিয়ে রাতারাতি উধাও হয়ে গেছে ‘আলহামদুলিল্লাহ ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস’ নামের একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র।

‎ঘটনার শুরু গত বছরের নভেম্বরের শেষভাগে। ‎সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নামমাত্র খরচে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর লোভনীয় অফার দেয় এজেন্সিটি। সেই ফাঁদে পা দিয়ে পাবনা, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন প্রান্তের শত শত মানুষ যোগাযোগ করেন।

‎তাদের বনানীর ১১ নম্বর রোডের ৭৬ নম্বর বাড়ির একটি আলিশান কার্যালয়ে (যা মূলত একটি ভাড়া করা যৌথ কর্মক্ষেত্র বা শেয়ার্ড অফিস) ডাকা হয়।

‎সেখানে প্রতিষ্ঠানের সিইও পরিচয়ধারী শামীম আহমেদ এবং নিজেকে সিডনিপ্রবাসী দাবি করা মাহফুজ নামের এক ব্যক্তি গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘বিদেশ যাওয়ার আগে বড় কোনো টাকা লাগবে না, শুধু প্রসেসিং খরচ দিলেই হবে।’ চলতি বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝিতে ফ্লাইটের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিশ্বাস অর্জনের জন্য দেখানো হয় অন্যান্য গ্রাহকদের ভিসা আবেদনের কপি।

‎বিশ্বস্ততার সেই নিখুঁত জালে জড়িয়ে একে একে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। গ্রাহকদের পাঠানো হয় ‘আল-আসিল মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড’-এ স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য।

এরপর গুলশানের অস্ট্রেলিয়ান বায়োমেট্রিক কালেকশন সেন্টারে বায়োমেট্রিক এবং থানা থেকে করানো হয় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স। ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখানোর নামেও নেওয়া হয় নগদ অর্থ। ধাপে ধাপে এসব খরচ মেলাতে গিয়ে একেকজন গ্রাহকের পকেট থেকে চলে যায় লাখ টাকারও বেশি।

‎অবশেষে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত এপ্রিল মাস। ১৯ এপ্রিল ভিসা নেওয়ার জন্য অফিসে গিয়ে সময় পিছিয়ে নেওয়ার অজুহাত শোনেন ভুক্তভোগীরা। এর কিছুদিন পরই সিইও শামীমের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সন্দিহান হয়ে ফারুকসহ অন্য গ্রাহকরা বনানীর অফিসে ছুটে গিয়ে দেখেন মূল দরজায় ঝুলছে তালা। ততক্ষণে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০টি পাসপোর্ট এবং কোটি কোটি টাকা নিয়ে সটকে পড়েছে পুরো চক্রটি। উল্টো পরবর্তীতে অন্য আরেকটি চক্রকে বাড়তি টাকা দিয়ে নিজেদের পাসপোর্ট উদ্ধার করতে হয়েছে অনেককে।

‎এই জালিয়াতির গভীরতা কতটুকু, তা উঠে এসেছে অস্ট্রেলিয়া সরকারের অফিশিয়াল ‘ইমি অ্যাকাউন্ট’ (ImmiAccount) সার্ভারের অনুসন্ধানে। ভুক্তভোগীদের দেওয়া ভিসা লজমেন্ট ও ট্রানজেকশন রেফারেন্স নম্বর দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা যায়, গ্রাহকদের হাতে ‘স্কিলস ইন ডিমান্ড’ (সাবক্লাস ৪৮২) নামক আকর্ষণীয় ওয়ার্ক ভিসার কাগজ ধরিয়ে দেওয়া হলেও, মূল সার্ভারে তাদের জন্য আবেদন করা হয়েছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া ‘ট্রানজিট ভিসার’ (সাবক্লাস ৭৭১) জন্য। যে ভিসা দিয়ে সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টা অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করা যায়।

‎বর্তমানে বনানীর সেই কথিত অফিস ও সৈনিক ক্লাব মোড়ের ‘আল-আসিল মেডিকেল সার্ভিসেস’-এর গেটে ঝুলছে তালা। ওয়েবসাইটের নম্বরে যোগাযোগ করেও কারও হদিস মিলছে না। কম খরচে ভাগ্য বদলাতে গিয়ে পাসপোর্ট আর শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে এখন দিশেহারা শত শত রেমিট্যান্স যোদ্ধা হওয়ার স্বপ্ন দেখা মানুষ।

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

মাত্র ৪৫ হাজারে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার স্বপ্নঃ

শত শত পাসপোর্ট ও কোটি টাকা নিয়ে চম্পট ট্রাভেল এজেন্সি

আপডেট সময়ঃ ০৪:০৩:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

‎ফেসবুকের ওয়ালে চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন, ঢাকার অভিজাত এলাকায় চোখধাঁধানো অফিস আর চা-মিষ্টির রাজকীয় আপ্যায়ন। স্বপ্নের দেশ অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার মোহে অন্ধ করতে এতটুকুই যথেষ্ট ছিল। 

‎মাত্র ৪৫ হাজার টাকায় উন্নত জীবনের আশায় বুক বেঁধেছিলেন পাবনার বেকার যুবক ফারুক হোসেনসহ দেশের বিভিন্ন জেলার শত শত সাধারণ মানুষ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন রূপ নিয়েছে এক দুঃস্বপ্নে। 

‎শত শত পাসপোর্ট আর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বনানীর সাজানো অফিস গুটিয়ে রাতারাতি উধাও হয়ে গেছে ‘আলহামদুলিল্লাহ ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস’ নামের একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র।

‎ঘটনার শুরু গত বছরের নভেম্বরের শেষভাগে। ‎সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নামমাত্র খরচে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর লোভনীয় অফার দেয় এজেন্সিটি। সেই ফাঁদে পা দিয়ে পাবনা, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন প্রান্তের শত শত মানুষ যোগাযোগ করেন।

‎তাদের বনানীর ১১ নম্বর রোডের ৭৬ নম্বর বাড়ির একটি আলিশান কার্যালয়ে (যা মূলত একটি ভাড়া করা যৌথ কর্মক্ষেত্র বা শেয়ার্ড অফিস) ডাকা হয়।

‎সেখানে প্রতিষ্ঠানের সিইও পরিচয়ধারী শামীম আহমেদ এবং নিজেকে সিডনিপ্রবাসী দাবি করা মাহফুজ নামের এক ব্যক্তি গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘বিদেশ যাওয়ার আগে বড় কোনো টাকা লাগবে না, শুধু প্রসেসিং খরচ দিলেই হবে।’ চলতি বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝিতে ফ্লাইটের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিশ্বাস অর্জনের জন্য দেখানো হয় অন্যান্য গ্রাহকদের ভিসা আবেদনের কপি।

‎বিশ্বস্ততার সেই নিখুঁত জালে জড়িয়ে একে একে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। গ্রাহকদের পাঠানো হয় ‘আল-আসিল মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড’-এ স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য।

এরপর গুলশানের অস্ট্রেলিয়ান বায়োমেট্রিক কালেকশন সেন্টারে বায়োমেট্রিক এবং থানা থেকে করানো হয় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স। ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখানোর নামেও নেওয়া হয় নগদ অর্থ। ধাপে ধাপে এসব খরচ মেলাতে গিয়ে একেকজন গ্রাহকের পকেট থেকে চলে যায় লাখ টাকারও বেশি।

‎অবশেষে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত এপ্রিল মাস। ১৯ এপ্রিল ভিসা নেওয়ার জন্য অফিসে গিয়ে সময় পিছিয়ে নেওয়ার অজুহাত শোনেন ভুক্তভোগীরা। এর কিছুদিন পরই সিইও শামীমের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সন্দিহান হয়ে ফারুকসহ অন্য গ্রাহকরা বনানীর অফিসে ছুটে গিয়ে দেখেন মূল দরজায় ঝুলছে তালা। ততক্ষণে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০টি পাসপোর্ট এবং কোটি কোটি টাকা নিয়ে সটকে পড়েছে পুরো চক্রটি। উল্টো পরবর্তীতে অন্য আরেকটি চক্রকে বাড়তি টাকা দিয়ে নিজেদের পাসপোর্ট উদ্ধার করতে হয়েছে অনেককে।

‎এই জালিয়াতির গভীরতা কতটুকু, তা উঠে এসেছে অস্ট্রেলিয়া সরকারের অফিশিয়াল ‘ইমি অ্যাকাউন্ট’ (ImmiAccount) সার্ভারের অনুসন্ধানে। ভুক্তভোগীদের দেওয়া ভিসা লজমেন্ট ও ট্রানজেকশন রেফারেন্স নম্বর দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা যায়, গ্রাহকদের হাতে ‘স্কিলস ইন ডিমান্ড’ (সাবক্লাস ৪৮২) নামক আকর্ষণীয় ওয়ার্ক ভিসার কাগজ ধরিয়ে দেওয়া হলেও, মূল সার্ভারে তাদের জন্য আবেদন করা হয়েছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া ‘ট্রানজিট ভিসার’ (সাবক্লাস ৭৭১) জন্য। যে ভিসা দিয়ে সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টা অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করা যায়।

‎বর্তমানে বনানীর সেই কথিত অফিস ও সৈনিক ক্লাব মোড়ের ‘আল-আসিল মেডিকেল সার্ভিসেস’-এর গেটে ঝুলছে তালা। ওয়েবসাইটের নম্বরে যোগাযোগ করেও কারও হদিস মিলছে না। কম খরচে ভাগ্য বদলাতে গিয়ে পাসপোর্ট আর শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে এখন দিশেহারা শত শত রেমিট্যান্স যোদ্ধা হওয়ার স্বপ্ন দেখা মানুষ।