০৪:২২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬

সমন্বয়হীনতায় থমকে আছে সুনামগঞ্জ ৫০০ শয্যা হাসপাতালের যাত্রা

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময়ঃ ০৩:২৮:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৯ বার পড়া হয়েছে।

 

হকবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট;

সুনামগঞ্জ ।। ০১ অক্টোবর ২০২৬

 

প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবকাঠামোর নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সুবিশাল আধুনিক ভবন। তবুও কবে নাগাদ চালু হবে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের ৫০০ শয্যার হাসপাতাল, তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিত এই হাসপাতালটির কার্যক্রম চালুর প্রক্রিয়ায় প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তঃদাপ্তরিক সমন্বয়হীনতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।

 

 

ভবন হস্তান্তর ও বুঝে নেওয়া, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং জনবল নিয়োগ—এই তিনের মধ্যে কোনটি আগে সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে তীব্র মতভিন্নতা দেখা দিয়েছে। ফলে চালুর প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়ে স্থবির হয়ে পড়েছে পুরোদমে হাসপাতালটি সচল করার উদ্যোগ।

 

 

সমন্বয়হীনতা ও মতভিন্নতা:

গণপূর্ত বিভাগ জানায়, হাসপাতাল ভবনের সব কাজ সম্পন্ন করে হস্তান্তরের জন্য এক বছরেরও বেশি সময় আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোল্লা রবিউল ইসলাম বলেন, “সংশোধিত চিঠি পাঠানোসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভবন পরিদর্শনও করে গেছেন। গণপূর্ত বিভাগের পক্ষ থেকে আর কোনো কাজ বাকি নেই।”

 

 

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনও ভবন বুঝে নেয়নি। নবনিযুক্ত উপপরিচালক আহমেদ হোসেনের মতে, ভবন বুঝে না নিলে প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া যাবে না। আর প্রশাসনিক অনুমোদন ও অর্থনৈতিক কোড না হলে ভবন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়।

 

 

অন্যদিকে, প্রকল্প পরিচালক কামরুজ্জামান ভিন্ন মত পোষণ করে বলেন, “চিকিৎসক ও কর্মচারীর অনুমোদিত জনবল নিয়োগ আগে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২১৫টি পদ অনুমোদন করলেও এখনো নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি। ভবন বুঝে নেওয়ার পরপরই এর বিশাল রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের দায়িত্বভার নির্ধারিত হওয়া জরুরি।”

 

 

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নহীনতা:

হাসপাতাল চালু ও শিক্ষক সংকট নিরসনের দাবিতে গত ২২ জুন আন্দোলনে নামেন মেডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা। মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের পর ৭ জুলাই ঢাকায় স্বাস্থ্য সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা।

 

 

বৈঠক শেষে সে সময় জানানো হয়েছিল—ছয় সপ্তাহের মধ্যে বহির্বিভাগ, অক্টোবরের মধ্যে মেডিসিন অন্তর্বিভাগ এবং ডিসেম্বরে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল চালু করা হবে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্ধারিত ছয় সপ্তাহের জায়গায় প্রায় ১১ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো ভবন হস্তান্তরই শেষ হয়নি।

 

 

প্রকল্পের পটভূমি ও বর্তমান অবস্থা:

২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর একনেক সভায় ১ হাজার ১০৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। ২০২০ সালের মার্চে সদর উপজেলার কাঠইর মৌজার মদনপুর পয়েন্টে ২৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়।

 

 

বর্তমানে হাসপাতাল, একাডেমিক ভবন, অডিটোরিয়াম, ছাত্রাবাস ও চিকিৎসকদের আবাসিক ভবনসহ প্রায় ২০টি সুদৃশ্য অবকাঠামো প্রস্তুত রয়েছে। ২০২১ সালে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে পাঠদান শুরু হলেও ২০২৪ সালে নতুন ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে পাঁচটি ব্যাচে প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত থাকলেও তীব্র শিক্ষক সংকট তাদের শিক্ষা কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে।

 

সমাধানের পথ:

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে দ্রুত একটি কার্যকর সমন্বয় সভা আয়োজন করা ছাড়া এই জটিলতার নিরসন সম্ভব নয়। অন্যথায়, কোটি কোটি টাকার আধুনিক সরকারি সম্পদ অব্যবহৃত থেকে যেমন নষ্ট হবে, তেমনি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত থাকবেন হাওরাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ।

ট্যাগসঃ

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

সমন্বয়হীনতায় থমকে আছে সুনামগঞ্জ ৫০০ শয্যা হাসপাতালের যাত্রা

আপডেট সময়ঃ ০৩:২৮:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

 

হকবার্তা ডেস্ক রিপোর্ট;

সুনামগঞ্জ ।। ০১ অক্টোবর ২০২৬

 

প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবকাঠামোর নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সুবিশাল আধুনিক ভবন। তবুও কবে নাগাদ চালু হবে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের ৫০০ শয্যার হাসপাতাল, তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিত এই হাসপাতালটির কার্যক্রম চালুর প্রক্রিয়ায় প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তঃদাপ্তরিক সমন্বয়হীনতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।

 

 

ভবন হস্তান্তর ও বুঝে নেওয়া, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং জনবল নিয়োগ—এই তিনের মধ্যে কোনটি আগে সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে তীব্র মতভিন্নতা দেখা দিয়েছে। ফলে চালুর প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়ে স্থবির হয়ে পড়েছে পুরোদমে হাসপাতালটি সচল করার উদ্যোগ।

 

 

সমন্বয়হীনতা ও মতভিন্নতা:

গণপূর্ত বিভাগ জানায়, হাসপাতাল ভবনের সব কাজ সম্পন্ন করে হস্তান্তরের জন্য এক বছরেরও বেশি সময় আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোল্লা রবিউল ইসলাম বলেন, “সংশোধিত চিঠি পাঠানোসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভবন পরিদর্শনও করে গেছেন। গণপূর্ত বিভাগের পক্ষ থেকে আর কোনো কাজ বাকি নেই।”

 

 

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনও ভবন বুঝে নেয়নি। নবনিযুক্ত উপপরিচালক আহমেদ হোসেনের মতে, ভবন বুঝে না নিলে প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া যাবে না। আর প্রশাসনিক অনুমোদন ও অর্থনৈতিক কোড না হলে ভবন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়।

 

 

অন্যদিকে, প্রকল্প পরিচালক কামরুজ্জামান ভিন্ন মত পোষণ করে বলেন, “চিকিৎসক ও কর্মচারীর অনুমোদিত জনবল নিয়োগ আগে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২১৫টি পদ অনুমোদন করলেও এখনো নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি। ভবন বুঝে নেওয়ার পরপরই এর বিশাল রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের দায়িত্বভার নির্ধারিত হওয়া জরুরি।”

 

 

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নহীনতা:

হাসপাতাল চালু ও শিক্ষক সংকট নিরসনের দাবিতে গত ২২ জুন আন্দোলনে নামেন মেডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা। মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের পর ৭ জুলাই ঢাকায় স্বাস্থ্য সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা।

 

 

বৈঠক শেষে সে সময় জানানো হয়েছিল—ছয় সপ্তাহের মধ্যে বহির্বিভাগ, অক্টোবরের মধ্যে মেডিসিন অন্তর্বিভাগ এবং ডিসেম্বরে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল চালু করা হবে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্ধারিত ছয় সপ্তাহের জায়গায় প্রায় ১১ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো ভবন হস্তান্তরই শেষ হয়নি।

 

 

প্রকল্পের পটভূমি ও বর্তমান অবস্থা:

২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর একনেক সভায় ১ হাজার ১০৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। ২০২০ সালের মার্চে সদর উপজেলার কাঠইর মৌজার মদনপুর পয়েন্টে ২৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়।

 

 

বর্তমানে হাসপাতাল, একাডেমিক ভবন, অডিটোরিয়াম, ছাত্রাবাস ও চিকিৎসকদের আবাসিক ভবনসহ প্রায় ২০টি সুদৃশ্য অবকাঠামো প্রস্তুত রয়েছে। ২০২১ সালে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে পাঠদান শুরু হলেও ২০২৪ সালে নতুন ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে পাঁচটি ব্যাচে প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত থাকলেও তীব্র শিক্ষক সংকট তাদের শিক্ষা কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে।

 

সমাধানের পথ:

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে দ্রুত একটি কার্যকর সমন্বয় সভা আয়োজন করা ছাড়া এই জটিলতার নিরসন সম্ভব নয়। অন্যথায়, কোটি কোটি টাকার আধুনিক সরকারি সম্পদ অব্যবহৃত থেকে যেমন নষ্ট হবে, তেমনি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত থাকবেন হাওরাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ।